মেথিকান্দা স্টেশনের ‘বুবি’: একটি নিস্তব্ধতার নির্মম খুন

উপ-সম্পাদকীয়, 8 July 2026, 25 বার পড়া হয়েছে,

বুবি মারা গেছেন। না, শব্দটা ভুল! – বরং সমাজের মানুষরূপী একদল পশু তাঁকে ঘুম থেকে জাগিয়ে, পিটিয়ে রক্তাক্ত করে মেরেছে। যে সমাজ একজন বোবা, নিঃস্ব বৃদ্ধার জমানো খুচরো পয়সার লোভে তাঁকে পিটিয়ে মারতে পারে, সে সমাজ আসলে সভ্যতার কোনো স্তরেই পড়ে না; বরং সেটি এক আদিম, পৈশাচিক শ্বাপদের অভয়ারণ্য।’

​সভ্যতার বড় বড় ইমারত, উন্নয়নের গগনচুম্বী আস্ফালন আর নাগরিক কোলাহলের আড়ালে মানুষের মনুষ্যত্ব ঠিক কতটা পচে-গলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে -তার এক নির্মম, নীরব সাক্ষী হয়ে রইল মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশন।

​বুবি মারা যাননি, আমাদের এই সমাজ তাঁকে খুন করেছে। সত্তর বছর বয়সী একজন বাক্‌প্রতিবন্ধী নারী, যাঁর পুরোটা জীবন কেটেছে স্টেশনের ধুলোবালির সাথে মিতালি করে, তাঁকে ঘুমের ঘোরে পিটিয়ে মারা হলো। অপরাধ? তাঁর আঁচলে বাঁধা ছিল তিল তিল করে জমানো চল্লিশ হাজার টাকা। দীর্ঘ ২৫টি বছর ধরে প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত স্টেশনের রুক্ষ প্ল্যাটফর্ম ঝাঁট দিয়ে, মানুষের কাছে হাত পেতে তিনি এই টাকা জমিয়েছিলেন। ঘাতকের দল শুধু বুবির প্রাণটাই কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে তাঁর পঁচিশ বছরের ঘাম, কষ্ট আর হয়তো না-বলা কোনো এক স্বপ্নের শেষ সম্বলটুকু।

​হিসেব করলে দেখা যায়, পঁচিশ বছরে চল্লিশ হাজার টাকা জমানোর অর্থ হলো- গড়ে প্রতিদিন মাত্র ৪ টাকা ৩৮ পয়সা সঞ্চয়। কী করতে চেয়েছিলেন বুবি এই যৎসামান্য খুচরো পয়সা জমিয়ে?

​সারা জীবন যিনি কথা বলতে পারেননি, তিনি হয়তো নিজের ভেতরেই একটা আস্ত পৃথিবী লালন করতেন। হয়তো ভেবেছিলেন, জীবনের শেষ দিনগুলোতে আর কারও কাছে হাত পাতবেন না। হয়তো পৃথিবীর মানচিত্র থেকে খসে পড়া একখণ্ড জমি কিনতে চেয়েছিলেন নিজের জন্য, যেখানে একটা ছোট্ট কুঁড়েঘর হবে। অথবা কে জানে, হয়তো নিজের শেষ ঠিকানার জন্য- এক টুকরো কবরের জায়গা বা সাদা কাফনের কাপড় কেনার জন্য এই টাকাগুলো তিনি বুকের ওমে আগলে রেখেছিলেন।

​বুবি কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দিয়ে যাননি। পঁচিশ বছর আগে ঠিক যেভাবে নিঃশব্দে কোনো এক নামহীন ট্রেনে চেপে তিনি মেথিকান্দা স্টেশনে নেমেছিলেন, ঠিক সেভাবেই অনন্তের পথে পাড়ি জমালেন। তাঁর এই দীর্ঘ নীরবতার জীবনে মেথিকান্দাই হয়ে উঠেছিল তাঁর আশ্রয়, তাঁর পৃথিবী। কিন্তু সেই পৃথিবী তাঁকে চরম বিশ্বাসঘাতকতার উপহার দিল।

​মৃত্যুর ঠিক আগে, ক্ষতবিক্ষত মুখ আর রক্তাক্ত শরীর নিয়ে মেথিকান্দা স্টেশনের সেই জংধরা লোহার চেয়ারটায় যখন বুবি বসেছিলেন, তাঁর শূন্য দৃষ্টিতে কী ছিল? অভিমান? নাকি এই নিষ্ঠুর সভ্যতার প্রতি চরম অবজ্ঞা?

​যখন জানোয়ারগুলো তাঁকে পৈশাচিক শক্তিতে আঘাত করছিল, তখন এই বাক্‌প্রতিবন্ধী মানুষটির ভেতরে যে আর্তনাদ গুমরে মরছিল, তা কি আমরা শুনতে পেয়েছি? তিনি হয়তো চিৎকার করে ডাকতে চেয়েছিলেন তাঁর ফেলে আসা অতীতের কাউকে- মাকে, বাবাকে, অথবা স্বয়ং ঈশ্বরকে। তাঁর সেই অব্যক্ত চিৎকার মেথিকান্দার রাতের বাতাসে মিশে গেছে, কিন্তু আমাদের বধির সমাজের কানে তা পৌঁছায়নি।

​বুবির ধর্ম কী ছিল, তাঁর শেকড় কোথায়- এসব কাগজের পরিচয়ে তাঁকে মাপা যাবে না। বুবির আসল পরিচয় ছিল তাঁর ‘অসহায়ত্ব’। আর এই সমাজ বারবার প্রমাণ করেছে, অসহায় মানুষের বুকের ওপর পাড়া দিয়েই তারা নিজেদের ‘শক্তিশালী’ ভাবতে ভালোবাসে।

​বুবির জন্য কোনো নাগরিক শোকসভা হবে না। তাঁর হত্যার বিচার চেয়ে কোনো প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিল বের হবে না পিচঢালা রাজপথে। টকশোগুলোতে বুদ্ধিজীবীদের ঝড় উঠবে না। কারণ, বুবি তো আমাদের কেউ নন! তিনি একজন রাষ্ট্রহীন, পরিচয়হীন, স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকা এক জীর্ণ ভিখারিনী।

​স্টেশনে যারা থাকে, তাঁদের রক্তে প্ল্যাটফর্ম ভিজলে আমাদের কীসের দায়? আমাদের সভ্য সমাজের তো হাজারটা কাজ! আমরা এখন অনেক ব্যস্ত। এক অসহায় বৃদ্ধার খুনের বিচার চাওয়ার মতো সময়, সহানুভূতি বা বিবেক- কোনোটাই যে আমাদের অবশিষ্ট নেই।

​বুবি চলে গেছেন, রেখে গেছেন এক অনন্ত নীরবতা। তাঁর না-থাকাটা হয়তো কয়েকদিন পর আর কেউ টেরই পাবে না। স্টেশনের বাতাসে আর কোনোদিন তাঁর ঝাঁটার পরিচিত শব্দ প্রতিধ্বনিত হবে না। কিন্তু মেথিকান্দা স্টেশনের ওই জংধরা লোহার চেয়ারটা আর বুবির শূন্য দৃষ্টি আমাদের সভ্যতার দিকে আঙুল তুলে আজীবন একথাই বলে যাবে- আমরা আসলে সভ্য হইনি, আমরা কেবল কথা বলতে পারা একদল পরিপাটি খুনি হয়েই বেঁচে আছি।

আদিত্য কামাল, সম্পাদক ও লেখক