আদিত্য কামাল : ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশ’ -ছোটবেলা থেকে ভূগোল বইয়ের পাতায় আর সাহিত্য-সংগীতে এই পরিচিতির সাথে আমরা বড় হয়েছি। জাল বিছিয়ে রাখা নদী আর তার বুকে ভেসে চলা পালতোলা নৌকা একসময় ছিল আমাদের রূপসী বাংলার মূল সৌন্দর্য। অথচ আজ এই পরিচয় যেন কেবলই স্মৃতির অ্যালবামে বন্দী হতে চলেছে। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের চতুর্থ রবিবারে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব নদী দিবস’। নদীর গুরুত্ব তুলে ধরা, নদীকে দখল ও দূষণের হাত থেকে রক্ষা করা এবং প্রাকৃতির এই মূল ধারাকে বাঁচিয়ে রাখাই এই দিবসের মূল অঙ্গীকার। ২০২৬ সালের এই বিশ্ব নদী দিবসে দাঁড়িয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় আত্মজিজ্ঞাসা হওয়া উচিত—আমরা কি আমাদের নদীগুলোকে সত্যিই ভালো রাখতে পেরেছি?
একসময় এই পলিমাটির দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় আট শতাধিক নদী প্রবাহমান ছিল। নদীগুলো শুধু পানির উৎস ছিল না; নদী ছিল আমাদের কৃষির প্রাণ, বাণিজ্যের প্রধান রুট এবং গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণভোমরা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পবর্জ্যের অনিয়ন্ত্রিত নিষ্কাশন, অবৈধ দখলদারিত্ব এবং বাঁধ নির্মাণের ফলে একের পর এক নদী তার স্বাভাবিক নাব্যতা হারিয়ে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েছে। দেশের প্রধান নদীগুলোর দিকে তাকালে আজ বুকে হাহাকার উঠে। যে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা কিংবা তুরাগ একসময় ঢাকার প্রাণ ছিল, তা আজ পরিণত হয়েছে বিষাক্ত বর্জ্যের ড্রেনে। গ্রামীণ জনপদের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ছোট ছোট নদ-নদীগুলো পলি পড়ে এবং দখলের থাবায় মরে শুকিয়ে গেছে, নতুবা মানচিত্র থেকেই মুছে গেছে।
নদী শুধু প্রকৃতির শোভা নয়, নদীর সাথে জড়িয়ে আছে লাখ লাখ মানুষের জীবিকা। জেলেরা মাছ ধরে সংসার চালায়, কৃষকের জমি নদীর পানিতে সোনা ফলায়, আর মাঝিমাল্লাদের জীবিকার চাকা ঘোরে নদীর ঢেউয়ে। নদী যখন মরে যায়, তখন নদীর সাথে সাথে মরে যায় একটি পুরো বাস্তুতন্ত্র, বাস্তুচ্যুত হয় হাজারও মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সংকটময় সময়ে নদীর নাব্য ও স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রাখা কেবল পরিবেশের প্রশ্ন নয়, এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়া যেমন আমাদের নদীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, ঠিক তেমনই দেশের ভেতরের অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতার অভাবও সমানভাবে দায়ী। আইন থাকলেও তার কঠোর প্রয়োগের অভাবে প্রভাবশালী দখলদাররা নদীর বুক দখল করে গড়ে তুলছে বহুতল ভবন ও শিল্পকারখানা। অথচ হাইকোর্ট নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ বা ‘আইনি ব্যক্তি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এর অর্থ হলো, নদীকে হত্যা করা বা ক্ষতি করা একজন মানুষকে আঘাত করার মতোই অপরাধ। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমরা কতটুকু সফল হতে পেরেছি?
বিশ্ব নদী দিবস ২০২৬ কেবল উদযাপনের দিন নয়, এটি হোক অঙ্গীকার ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দিন। শুধু একদিনের সভা-সেমিনার বা ব্যানার টাঙিয়ে নদী রক্ষা করা সম্ভব নয়। নদীকে বাঁচাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন— দখলদারদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা: নদী দখলকারীদের পরিচয় যাই হোক না কেন, দ্রুত তাদের উচ্ছেদ করতে হবে এবং আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কঠোর করা: কোনো শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য যেন নদীতে পড়তে না পারে, সে জন্য ইটিপি (ETP) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং তার নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা।
নদী খনন ও নাব্যতা পুনরুদ্ধার: মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে দেশের মৃতপ্রায় ও পলি জমে ভরাট হওয়া নদীগুলোকে খনন করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা।
সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি: প্লাস্টিক ও গৃহস্থালির বর্জ্য নদীতে না ফেলার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নদী রক্ষা কমিটিগুলোকে কার্যকর করা।
জল ও পলির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই বাংলাদেশ নদীর কাছে দেনাদার। আমরা যদি আজ নদীকে না বাঁচাই, তবে আগামী প্রজন্ম এক ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় ও মরুভূমির মতো শুষ্ক এক বাংলাদেশে বাস করতে বাধ্য হবে। নদী বাঁচলে নদীমাতৃক এই বাংলাদেশ বাঁচবে। আসুন, এই নদী দিবসে আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি—আমরা দখল ও দূষণ থেকে আমাদের নদীগুলোকে মুক্ত রাখব, নদীকে আবার তার চেনা গান গাইতে দেব।