আদিত্য কামাল : জীবন এক অদ্ভুত ক্যানভাস, যেখানে প্রতিনিয়ত আমরা সফলতার রং ছড়াতে চাই। আমরা ট্রফি ভালোবাসি, করতালি পছন্দ করি আর বিজয়ের জয়গান গাইতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কিন্তু এই চকচকে সফলতার পেছনের যে দীর্ঘ অন্ধকার গলিটি রয়েছে—যে গলির নাম ‘ব্যর্থতা’—সেটিকে আমরা চিরকাল এড়িয়ে চলতে চাই। অথচ সত্য এটাই যে, জীবনের পথচলায় ব্যর্থতা কোনো প্রান্তিক স্টেশন নয়; এটি সাফল্যের পথেরই একটি অপরিহার্য বাঁক।
প্রতি বছর ১৩ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব ব্যর্থতা দিবস’। ২০১০ সালে ফিনল্যান্ডের আল্টো ইউনিভার্সিটির একদল তরুণ শিক্ষার্থীর হাত ধরে এই ব্যতিক্রমী দিবসটির যাত্রা শুরু হয়। তাঁদের মূল বার্তা ছিল স্পষ্ট—ভুল বা ব্যর্থতাকে লজ্জার বিষয় না বানিয়ে, একে উদযাপনের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ ব্যর্থতাকে ভয় পাওয়ার অর্থ হলো নতুন কিছু চেষ্টা করার সাহসিকতাকে বিসর্জন দেওয়া।
আমাদের সমাজে সাফল্যকে যেভাবে মহিমান্বিত করা হয়, তার ঠিক উল্টো পিঠে ব্যর্থতাকে দেখা হয় এক ধরণের সামাজিক অপরাধ হিসেবে। কোনো পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত নম্বর না পাওয়া, ব্যবসায়িক উদ্যোগে লোকসান হওয়া, কিংবা ক্যারিয়ারে কাঙ্ক্ষিত পদে পৌঁছাতে না পারা—প্রতিটি ক্ষেত্রকেই আমরা ব্যক্তিজীবনের চূড়ান্ত দেউলিয়াত্ব বলে মনে করি। এই সামাজিক মনস্তত্ত্বের কারণে আজ তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ ভুল করার ভয়ে নতুন কোনো উদ্যোগ নিতে সাহস পায় না। তারা নিরাপত্তার চাদর মুড়ি দিয়ে এক চেনা বৃত্তে বন্দি হয়ে পড়ে।
অথচ বিশ্ব ইতিহাসের প্রতিটি বড় অর্জনের দিকে তাকালে দেখা যাবে, তার গোড়াপত্তন হয়েছিল অজস্র ব্যর্থতার ধ্বংসস্তূপের ওপর। থমাস আলভা এডিসন বৈদ্যুতিক বাল্ব আবিষ্কারের আগে হাজারবার ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাঁকে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল এই ব্যর্থতা নিয়ে, তিনি সরল উত্তর দিয়েছিলেন—“আমি ব্যর্থ হইনি, আমি শুধু এমন দশ হাজার উপায় খুঁজে পেয়েছি যা কাজ করে না।” হেনরি ফোর্ড তাঁর বিখ্যাত গাড়ি তৈরির ব্যবসা দাঁড় করানোর আগে একাধিকবার দেউলিয়া হয়েছিলেন। সফলতার চূড়ায় পৌঁছানো প্রতিটি মানুষের জীবনের সাধারণ অনুঘটক এটিই—তাঁরা ব্যর্থতাকে জীবনের শেষ ভেবে থেমে যাননি, বরং একে পরবর্তী পদক্ষেপের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
আমাদের শিক্ষা ও সামাজিক ব্যবস্থায় এখন সময় এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তনের। ব্যর্থতাকে অপরাধবোধ বা হতাশার কারণ না বানিয়ে, তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
ব্যর্থতা মানে কোনো মানুষের জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার অকার্যকারিতা। মানুষ নিজে ব্যর্থ নয়, তার গৃহীত পদ্ধতিটি হয়তো কাজ করেনি। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি বোঝা জরুরি।
প্রতিটি ভুল একটি নতুন দিকনির্দেশনা দেয়। ‘কোথায় ভুল হয়েছিল’—এই বিশ্লেষণের মধ্য দিয়েই অর্জিত হয় সত্যিকারের অভিজ্ঞতা, যা কোনো বই পড়ে বা প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ থেকে মেলে না।
সমাজ যখন ব্যর্থতাকে সহজভাবে মেনে নিতে শিখবে, তখন তরুণ সমাজের ওপর তৈরি হওয়া অমূলকাঙ্ক্ষার মনস্তাত্ত্বিক চাপ কমবে। এতে ডিপ্রেশন বা আত্মহত্যার মতো চড়ামূল্য দেওয়ার প্রবণতাও হ্রাস পাবে।
বিশ্ব ব্যর্থতা দিবসের আসল সার্থকতা উদযাপনে নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের অঙ্গীকারে। নতুন উদ্যোক্তা, তরুণ সমাজ কিংবা পেশাজীবী—সবার জন্যই আজ একটাই বার্তা: ভুল করতে ভয় পাবেন না। কারণ, যে কখনো ভুল করেনি, সে নতুন কিছু চেষ্টা করার সাহসই দেখায়নি।
আজকের এই দিনে আসুন আমরা ব্যর্থতার ভয়কে পেছনে ফেলে নতুন উদ্যোগে পা বাড়াই। কারণ, পতন যদি অনিবার্য হয়, তবে পুনরুত্থান হবে আরও শক্তিশালী ও দৃঢ়। জীবনের প্রতিটি ব্যর্থতাই আসলে আমাদের আরও বেশি পরিপক্ব ও প্রজ্ঞাবান করে তোলার এক একটি গোপন পাঠশালা।
