মো. আজহার উদ্দিন,ব্রাহ্মণবাড়িয়া : ডায়াবেটিসজনিত জটিলতায় মৃত্যুবরণকারী আখতার হোসেনের শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে বেওয়ারিশ লাশ দাফনের সংগঠন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর। সংগঠনটির পক্ষ থেকে মরহুমের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে এবং তার চারটি নিষ্পাপ শিশু সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কিনে দেওয়া হয়েছে।
গত সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুহিলপুর ইউনিয়নের সুহিলপুর গ্রামের নদ্দা পাড়ায় মরহুম আখতার হোসেনের বাড়িতে গিয়ে তার মা ও শ্বশুরের হাতে এই আর্থিক সহায়তা তুলে দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিনিধিরা।
এ সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. আজহার উদ্দিন বলেন, “আখতার হোসেনের মৃত্যু আমাদের সমাজের একটি নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে। চিকিৎসা যদি টাকার অভাবে থেমে যায়, তাহলে সেটি শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের ব্যর্থতা। আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর চেষ্টা করি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে, কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে গরিব মানুষের জন্য টেকসই ও মানবিক চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে না উঠলে এ ধরনের মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। আখতারের চারটি শিশুর ভবিষ্যৎ আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়া উচিত।”
আখতার হোসেন (৩৭) ছিলেন মরহুম নুরু মিয়ার সন্তান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ২৪ জানুয়ারি (শুক্রবার) দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, চারটি নিষ্পাপ শিশু সন্তান ও বৃদ্ধ মাকে রেখে গেছেন। তার মৃত্যুতে মুহূর্তেই একটি পরিবার চরম অসহায়ত্বের মুখে পড়ে চারটি শিশু হয়ে যায় এতিম, স্ত্রী হন বিধবা এবং মা হারান নিজের কলিজার ধন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত আখতার হোসেনের বাম পায়ে প্রথমে একটি ঘা সৃষ্টি হয়। পরে তা ইনফেকশন করলে তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল থেকে ঢাকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখানে প্রায় দুই মাস চিকিৎসার পর তার বাম পা উরু পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়। পরবর্তীতে ঢাকায় ১৬ দিন চিকিৎসা শেষে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে আরও ৫–৬ দিন চিকিৎসা নেন। কিন্তু পুনরায় ইনফেকশন দেখা দিলে তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কুমারশীল মোড়ের হালিল্যাব হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভর্তি করা হয়। সেখানে আট দিন চিকিৎসার পর আবারও বাম পায়ের উরু কেটে দিতে হয় এবং টানা ১২ দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়। দীর্ঘ চিকিৎসা ব্যয়ে পরিবারটি সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়লে গ্রামের সাধারণ মানুষ চাঁদা তুলে তার পাশে দাঁড়ান। হাসপাতালের বিল পরিশোধে অক্ষম হওয়ায় আখতারকে আরও তিন দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। পরে গ্রামবাসীর আর্থিক সহযোগিতা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করে তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে গত ২৩ জানুয়ারি পুনরায় হালিল্যাব হাসপাতালে ভর্তি করা হলে রক্তশূন্যতার কারণে রক্ত দেওয়ার প্রস্তুতির সময় পরদিন, ২৪ জানুয়ারি দুপুরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় প্রায় চার লক্ষ টাকা ব্যয় হয়, যা মূলত গ্রামের মানুষের সহানুভূতি ও সহযোগিতায় সংগ্রহ করা হয়েছিল।