মৃত্যুর চাকা ব্যাটারিচালিত রিকশা: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আর কত প্রাণ ঝরবে?

মতামত, 12 June 2026, 16 বার পড়া হয়েছে,

সড়ক যেন এখন এক একটি মৃত্যুফাঁদ, আর সেই ফাঁদের নতুন ও ভয়ঙ্কর অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশা ও ইজিবাইক। গত দুই দিনেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন দুজন মানুষ। যার মধ্যে একজন আমার চাচা। ঘর থেকে সুস্থ মানুষটি বের হলেন, কিন্তু ফিরলেন লাশ হয়ে। এই যে আকস্মিক শূন্যতা, একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ এবং চিরকালের কান্না—এর দায় আসলে কার? শুধু কি ওই অসচেতন চালকের, নাকি পুরো প্রশাসন ও ব্যবস্থার?

​সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরসহ বিভিন্ন উপজেলার মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত রিকশার দাপট আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে। শহরের টিএ রোড, কুমারশীল মোড়, কাউতলী, ভাদুঘর কিংবা পৈরতলা—সবখানেই এখন এই ‘গতির দানবদের’ রাজত্ব।

এই রিকশাগুলোর বডি বা কাঠামো তৈরি করা হয়েছে অত্যন্ত হালকাভাবে, যা মূলত সাধারণ প্যাডেল রিকশার উপযোগী। কিন্তু এতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মোটর ও ব্যাটারি যুক্ত করায় এর গতি সাধারণ রিকশার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। গতি বেশি হলেও এর ব্রেকিং সিস্টেম অত্যন্ত দুর্বল। ফলে জরুরি প্রয়োজনে ব্রেক কষলেই রিকশা উল্টে যায়।

কোনো প্রকার প্রশিক্ষণ বা ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই যে কেউ এই রিকশা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ছে। এমনকি অনেক অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরকেও এই মারাত্মক বাহনটি চালাতে দেখা যায়, যাদের ট্রাফিক আইন বা সড়কের নিয়ম কানুন সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।

উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও লোকাল রোড পার হয়ে এই ধীরগতির অথচ বিপজ্জনক বাহনগুলো কুমিল্লা-সিলেট বা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে উঠে পড়ছে। দূরপাল্লার দ্রুতগামী বাসের সামনে হুটহাট মোড় নিতে গিয়েই ঘটছে বড় বড় দুর্ঘটনা।

​”উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা এবং প্রশাসনের মাঝেসাঝে চালানো লোকদেখানো অভিযানের পরও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রতিটি অলিতে-গলিতে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।”

​কাগজে-কলমে গত দুদিনে দুজন মারা যাওয়ার খবর হয়তো অনেকের কাছে স্রেফ একটি পরিসংখ্যান। কিন্তু যে পরিবার তার মানুষটিকে হারিয়েছে, যে সন্তান তার পিতাকে হারিয়েছে, তাদের জিজ্ঞেস করুন এই ক্ষতির গভীরতা কতখানি। প্রতিদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কোথাও না কোথাও এই রিকশার ধাক্কায় মানুষ পঙ্গু হচ্ছে, হাত-পা ভাঙছে। সদর হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় অংশের শিকার এই ব্যাটারিচালিত রিকশার যাত্রী বা পথচারীরা।

এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে আর চুপ করে থাকার সুযোগ নেই। প্রশাসনকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে:

মহাসড়ক ও শহরের প্রধান সড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। এই রিকশাগুলোর ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার জন্য শহরে ব্যাঙের ছাতার মতো অবৈধ চার্জিং স্টেশন গড়ে উঠেছে, যা দেশের মূল্যবান বিদ্যুৎ অপচয় করছে। এগুলো সিলগালা করতে হবে। চালকদের প্যাডেল রিকশায় ফিরে যেতে উৎসাহিত করা অথবা সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় এনে কম গতির নিরাপদ বাহনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

আমরা আর কোনো পরিবারকে এভাবে এতিম বা নিঃস্ব হতে দেখতে চাই না। আমার চাচার মৃত্যু যেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা/অটোরিকশার তাণ্ডব বন্ধের শেষ সতর্কবার্তা হয়। প্রশাসনের কাছে বিনীত অনুরোধ, দয়া করে আর কালক্ষেপণ করবেন না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সড়কগুলোকে সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ করুন, এই ‘চলন্ত মৃত্যুফাঁদ’ থেকে শহরকে মুক্ত করুন।

আদিত্ব্য কামাল, সম্পাদক জনতার খবর