গাধা: অবহেলিত এক বন্ধু ও আমাদের অকৃতজ্ঞতা

মতামত, 8 May 2026, 11 বার পড়া হয়েছে,

মানুষের সভ্যতার ক্রমবিকাশে যে কটি প্রাণী প্রত্যক্ষভাবে শ্রম দিয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম হলো গাধা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে ‘গাধা’ শব্দটি কেবল একটি প্রাণীর নাম নয়, বরং এটি চরম নির্বুদ্ধিতা ও নেতিবাচকতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। আজ ৮ মে, বিশ্ব গাধা দিবস। এই দিনটি অন্তত আমাদের একটু থমকে দাঁড়িয়ে ভাবার সুযোগ দেয়—আমরা কি এই প্রাণীটির প্রতি যথাযথ বিচার করছি?

খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ বছর আগে থেকেই গাধা মানুষের বোঝা বহন করে আসছে। মরুভূমির তপ্ত বালু হোক বা পাহাড়ি দুর্গম পথ—গাধার ধৈর্য ও সহ্যক্ষমতা অতুলনীয়। পৃথিবীর অনেক দেশে যেখানে যান্ত্রিক যান পৌঁছাতে পারে না, সেখানে আজও গাধাই একমাত্র ভরসা। এটি এমন এক প্রাণী যা অত্যন্ত অল্প খাবারে বেঁচে থাকতে পারে এবং প্রতিকূল পরিবেশে দীর্ঘ সময় কাজ করার ক্ষমতা রাখে। অথচ আমরা পরিশ্রমী কাউকে প্রশংসা না করে বরং বিদ্রুপ করে বলি ‘গাধার মতো খাটুনি’।

গাধাকে আমরা নির্বোধ ভাবলেও প্রাণীবিজ্ঞানীদের মতে, গাধা মোটেও বোকা নয়। বরং গাধা অত্যন্ত সতর্ক এবং নিজের সুরক্ষার ব্যাপারে সচেতন। ঘোড়ার তুলনায় গাধার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বেশি ‘যুক্তিনির্ভর’। কোনো রাস্তায় বিপদ দেখলে গাধা সহজে সেখানে যেতে চায় না, যাকে আমরা প্রায়ই ‘গাধার জেদ’ বলে ভুল করি। আসলে এটি তাদের আত্মরক্ষার একটি কৌশল। তাদের স্মৃতিশক্তিও বেশ প্রখর; তারা ২৫ বছর আগের চেনা রাস্তা বা সাথীকে মনে রাখতে পারে।

বিশ্বজুড়ে কয়েক কোটি গাধা প্রান্তিক মানুষের জীবিকার সংস্থান করছে। বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার কৃষি ও পরিবহন খাতে এর ভূমিকা অপরিসীম। পরিবেশবান্ধব পরিবহনের ক্ষেত্রেও গাধার কোনো বিকল্প নেই। অথচ নগরায়ন ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এই প্রাণীটি আজ অনেক দেশেই অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে।

একটি সমাজ কতটা উন্নত, তা বোঝা যায় সেই সমাজের প্রাণীকুলের প্রতি আচরণের মধ্য দিয়ে। গাধার প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধ করা এবং একে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। বিশ্ব গাধা দিবসের সার্থকতা তখনই আসবে, যখন আমরা বুঝতে শিখব যে প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টির নিজস্ব মর্যাদা ও গুরুত্ব রয়েছে।

​গাধাকে গালি হিসেবে নয়, বরং ধৈর্য এবং নিরলস পরিশ্রমের উদাহরণ হিসেবে দেখা উচিত। আজ এই দিবসে প্রত্যাশা থাকবে—বোবা এই প্রাণীটির প্রতি মানুষের মমতা ও সম্মান বাড়ুক।

আদিত্ব্য কামাল, সম্পাদক জনতার খবর