রাজধানীর পল্লবীতে ৭ বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় আজ স্তব্ধ গোটা দেশ। এই নিষ্পাপ শিশুর নিথর দেহ আমাদের সামনে আবার সেই চেনা, যন্ত্রণাদায়ক প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিয়েছে—আর কত? আর কত নারী ও শিশুকে এভাবে পৈশাচিকতার বলি হতে হবে? রামিসার পরিবারের কান্নায় যখন আকাশ-বাতাস ভারী, তখন দেশের সাধারণ মানুষের ক্ষোভের তীর বিচার ব্যবস্থার দিকে। ক্ষোভের কারণটি অত্যন্ত স্পষ্ট: আমাদের দেশে জঘন্যতম অপরাধের ক্ষেত্রেও অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বছরের পর বছর দেরি, নিম্ন আদালতের রায় হতে দীর্ঘসূত্রিতা, আর তারপর উচ্চ আদালতে আপিলের পর আপিল, রায় প্রদান ও সাজা কার্যকরে অন্তহীন সময়ক্ষেপণ—এই চক্রে পড়ে চাপা পড়ে যাচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বিচার পাওয়ার আশা।
রামিসার ঘটনার দিকে তাকালে বিগত বছরগুলোর আরও অনেক নির্মম চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে। গত বছর একইভাবে পৈশাচিকতার শিকার হয়েছিল ৮ বছর বয়সী শিশু আছিয়া। ধর্ষণের পর ৮ দিন যন্ত্রণায় ছটফট করে মারা যায় শিশুটি। অভিযুক্ত হিটু শেখের ফাঁসির রায় হলেও সেটি আজও উচ্চ আদালতের আপিলের বেড়াজালে ঝুলে আছে।
একই চিত্র দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর সিরিয়াল কিলার ও ধর্ষক মশিউর রহমান ওরফে রসু খাঁর মামলার ক্ষেত্রেও। আজ থেকে দেড় যুগেরও বেশি সময় আগে, ২০০৯ সালে টঙ্গী থেকে মসজিদের ফ্যান চুরির মামলায় ধরা পড়ার পর বেরিয়ে এসেছিল এই ছিঁচকে চোরের ভয়ংকর রূপ। পুলিশের কাছে সে অকপটে স্বীকার করেছিল ১১ জন নারী পোশাকশ্রমিককে প্রেমের ফাঁদে ফেলে, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ ও শ্বাসরোধ করে হত্যার কথা। তার বিকৃত লক্ষ্য ছিল ১০১টি হত্যাকাণ্ড ঘটানো!
২০০৯ সালের জুলাই মাসে ফরিদগঞ্জে পোশাকশ্রমিক পারভীনকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় ২০১৮ সালে চাঁদপুরের আদালত রসু খাঁসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সেই রায়ের পর কেটে গেছে আরও বহু বছর। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে হাইকোর্ট তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখলেও আজ ২০২৬ সালেও সেই সাজা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। দেড় যুগেও এই সিরিয়াল কিলারের পূর্ণাঙ্গ বিচার ও সাজা কার্যকর না হওয়া পুরো বিচার ব্যবস্থার স্থবিরতাকেই কি প্রমাণ করে না?
গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির সেলে রসু খাঁ বহাল তবিয়তে রাষ্ট্রীয় খাবার খেয়ে দিন পার করছে। অথচ তার শিকার হওয়া হতভাগ্য নারী ও শিশুদের পরিবারগুলো আজও চোখের জল ফেলছে।
রসু খাঁর শিকার হওয়া নারীদের বেশিরভাগেরই সঠিক পরিচয় না পাওয়ায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতেই লেগে গেছে বছরের পর বছর।
সমাজে প্রায়ই ধর্ষণকে ‘বিকৃত বা অসুস্থ মানসিকতা’র ফল বলে আখ্যা দেওয়া হয়। এটি এক ধরনের ভুল ন্যারেটিভ, যা অপরাধীকে আড়ালে সমাজ থেকে একপ্রকার ছাড় পাইয়ে দেয়। এটি কোনো অসুস্থতা নয়, এটি চরম অপরাধ প্রবণতা।
নিম্ন আদালতের রায়ের পর উচ্চ আদালতে আপিল নিষ্পত্তিতে বছরের পর বছর সময় লেগে যাওয়া ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে মানসিকভাবে দুর্বল ও হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
অনেক ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগ নিয়ে অপরাধী পক্ষ প্রভাবশালী হলে ধর্ষকের সাথে ধর্ষিতার বিয়ে দিয়ে বা অন্য উপায়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে।
কোনো একটি ঘটনা ঘটলে মিডিয়া ও সুশীল সমাজ প্রথম দিকে যতটা সক্রিয় থাকে, সময় বাড়ার সাথে সাথে এবং বিচার চলাকালীন সময়ে সেই ভূমিকা অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়ে। ফলে রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর থেকে চাপ কমে যায়।
একজন অপরাধী যদি স্পষ্ট বুঝতে পারে যে অপরাধ করলে তাকে নিশ্চিত এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে কঠোর শাস্তি পেতেই হবে, তবেই সমাজে অপরাধের প্রবণতা কমবে।
রামিসা, আছিয়া কিংবা রসু খাঁর হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারানো ১১ জন পোশাকশ্রমিকের আত্মা তখনই শান্তি পাবে, যখন এই বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতার অবসান ঘটবে। আমাদের আইনি ব্যবস্থার গলদগুলো দূর করে, বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে রায় ও সাজা কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি সমাজকে আরও বেশি অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে, আর আমাদের বারবার প্রশ্ন তুলতে হবে—পরবর্তী রামিসা কিংবা আছিয়া কে?