
“একজন গোবিন্দ হালদার ও
যুদ্ধবন্ধুদের প্রতি আমাদের
লজ্জাজনক আচরণ!”
————————————————-
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গের অখ্যাত এক কবি কিছু কবিতা লিখে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পাঠাতে শুরু করলেন। সমর দাস আপেল মাহমুদরা সেই কবিতা গুলোয় সুর দিয়ে গান বানালেন। সেইসব গান মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করছে। যেগুলো এখনো রক্তে আগুন ধরায়। উনার লেখা কবিতা গুলো হচ্ছে ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্ত লাল, জোয়ার এসেছে জনসমুদ্রে’ ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’ এরকম বেশ কয়েকটা।
অখ্যাত এই কবির নাম গোবিন্দ হালদার। ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি মারা গিয়েছেন। শেষ জীবনেও খুব অর্থকষ্টে ছিলেন। অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার টাকা ছিলনা। ঘরবাড়ি ছিলনা শেষের দিকে। শশুরবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। উনার খোঁজ দীর্ঘদিন কেউ করেনি। আমরা স্বাধীনতা দিবসে বিজয় দিবসে উনার গান বাজাই। উদ্দীপ্ত হই। এসব অনুষ্ঠানে শত কোটি টাকা খরচ করি। কিন্তু উনি খেয়ে না খেয়ে উদ্বাস্তু হয়ে অসুস্থ অবস্থায় রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। কী নির্মম!
মৃত্যুর কিছদিন আগে এ নিয়ে লেখালেখি হওয়ায় শেখ হাসিনা উনার চিকিৎসার সমস্ত ভার নিয়েছিলেন। এককালীন ১৫ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ভারত সফরের সময় উনাকে দেখতে গিয়েছিলেন। তখন উনি আইসিইউতে। তার সপ্তাহখানেক পরই উনি মারা যান।
এসব যুদ্ধবন্ধুদেরকে আমরা কয়েক বছর আগে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দিয়েছি। সম্মাননার সার্টিফিকেট-ক্রেস্টের সাথে একটা গোল্ড মেডেলও ছিল। মেডেলে এক ভরি করে স্বর্ণ থাকার কথা। কিছুদিন পর দেশের একটা শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এক ভরি স্বর্ণ থেকে কর্তা ব্যক্তিরা বারো আনাই মেরে দিয়েছেন! স্বর্ণ ছিল মোটে চার আনা!
এই হচ্ছে আমাদের যুদ্ধবন্ধুদের প্রতি সম্মান দেখানোর নমুনা! যারা প্রতিটা মেডেল থেকে বারো আনা স্বর্ণ মেরে দিয়েছে তাদের বিচার হয়নি আজও। তাদের অনেকে হয়তো মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেটও বানিয়ে নিয়েছে এখন। তারাই দেশে এখন আসল মুক্তিযোদ্ধা। সাচ্চা দেশপ্রেমিক। আর গোবিন্দ হালদাররা টাকার অভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পর তৎক্ষনাৎ একটি গান রচনা করে সুরারোপ করা হয়। এরপর রেকর্ড করে বাজানো হয় রেডিওতে। গোবিন্দ হালদারের লেখা সেই গানটি হলো- ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে, বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা- আমরা তোমাদের ভুলবোনা’
আসলে আমরা ভুলে গিয়েছি! গোবিন্দ হালদারকে তো বটেই, এমনকি গানটি প্রথম যিনি গেয়েছেন সেই স্বপ্না রায়কে! তিনি এখন কোথায় আছেন কেমন আছেন, সেটা আরেক গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে!
গোবিন্দ হালদার (জন্মঃ ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০–মৃত্যুঃ ১৭ জানুয়ারি ২০১৫) এর প্রয়াণ দিবসে সমগ্র ফেসবুক পরিবার তথা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
কপি পোস্ট, জুয়েল দেব।