কিশোর অপরাধের মনস্তত্ত্ব ও উদীয়মান গ্যাং কালচার: সমাজ কি তার দায় এড়াতে পারে?

মতামত, 25 September 2026, 15 বার পড়া হয়েছে,

এইচ এম জাকারিয়া : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের শহরাঞ্চল থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘কিশোর গ্যাং’ বা টিনএজ গ্যাং কালচার সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক তীব্র উদ্বেগের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাড়া-মহল্লার অলিগলি, স্কুল-কলেজের সীমানা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিলস ও টিকটকের ভার্চুয়াল দুনিয়া—সবখানেই এই কিশোর অপরাধীদের অপতৎপরতা চোখে পড়ার মতো। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসা এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে উঠতি বয়সের তরুণরা।

​কিশোর গ্যাংয়ের বর্তমান প্রেক্ষাপট কেবল কোনো সাধারণ আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি। এ তরুণরা সাধারণত ১৪ থেকে ২০ বছর বয়সী। যে বয়সে হাতে বই, খেলার সামগ্রী বা সৃজনশীল কোনো মেধার বিকাশ ঘটার কথা, সেই বয়সে তাদের হাতে উঠছে দেশীয় অস্ত্র। গ্যাংয়ের নাম দেওয়া হচ্ছে উদ্ভট ও আকর্ষণীয়—যেমন ‘হিরো গ্যাং’, ‘ডেঞ্জার বয়েজ’ কিংবা ‘ব্লেড গ্রুপ’। ভার্চুয়াল জগতে আধিপত্য বিস্তার ও সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার তাড়না থেকে শুরু হওয়া এসব গ্যাং একপর্যায়ে স্থানীয় জ্যেষ্ঠ অপরাধী বা তথাকথিত রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’দের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে পরিণত হচ্ছে রাজনৈতিক লাঠিয়াল বাহিনীতে।

আধুনিক জীবনযাত্রার ব্যস্ততায় মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের মানসিক দূরত্বের সুযোগে কিশোররা বাইরে নিজেদের নিরাপদ আশ্রয় বা পরিচিতি খোঁজে। সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে তারা ভুল পথে পা বাড়ায়।

স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা পাড়া-মহল্লার রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের স্বার্থ হাসিল, মিছিল-সমাবেশে লোক ভারী করা এবং ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলার জন্য এসব কিশোরকে ব্যবহার করছে। ফলে এই কিশোররা একধরনের অপরাধমূলক দায়মুক্তি বা আইন অমান্য করার সাহস পায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্যাং কালচারকে গ্লোরিফাই বা রোমাঞ্চকর হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। হিংসাত্মক ভিডিও গেমস এবং গ্যাংস্টার-কেন্দ্রিক সিনেমা তাদের মধ্যে সংঘাতকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি করছে।

নগরায়নের চাপে শহরাঞ্চলে খেলার মাঠ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক অভাব ঘটেছে। ফলে কিশোরদের উদবৃত্ত শক্তি ও কৌতূহল গঠনমূলক কাজে ব্যবহৃত না হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

​কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে কেবল পুলিশি অভিযান বা কঠোর আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়। অপরাধে জড়ানোর পর শাস্তি দেওয়ার চেয়ে অপরাধের গোড়ায় হাত দিয়ে তা প্রতিরোধ করা বেশি জরুরি।

​প্রথমত, পরিবারকে প্রথম দুর্গ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সন্তানের সঙ্গ, তাদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ধরন এবং আচরণগত পরিবর্তনের দিকে অভিভাবকদের নজর রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, কিশোরদের ওপর রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধে কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। যেসব তথাকথিত ‘বড় ভাই’ কিশোরদের পথভ্রষ্ট করছে, তাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। তৃতীয়ত, এলাকাভিত্তিক খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও তরুণদের ইতিবাচক সামাজিক উদ্যোগে যুক্ত করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

​কিশোররা একটি দেশের ভবিষ্যৎ। আজকের এই কিশোরেরা অপরাধের অন্ধকারে হারিয়ে গেলে আগামী দিনে তার খেসারত গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রকেই দিতে হবে। তাই সমন্বিত সামাজিক প্রতিরোধ, সঠিক পারিবারিক শিক্ষা এবং কঠোর আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমেই এই গ্যাং কালচার থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হবে।