চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ: এক নির্মম ব্যাধি ও আমাদের বিবেক

মতামত, 2 July 2026, 11 বার পড়া হয়েছে,

রেলপথকে বলা হয় গণমানুষের সবচেয়ে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যোগাযোগ মাধ্যম। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই নিরাপদ ভ্রমণের সমার্থক শব্দটি রূপ নিয়েছে এক নির্মম আতঙ্কে। আর এই আতঙ্কের নেপথ্যে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং রয়েছে কিছু মানুষের বিকৃত মানসিকতা— চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ। আপাতদৃষ্টিতে একে অনেকের কাছে ‘দুষ্টুমি’ বা ‘খেলা’ মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবিকভাবে এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ এবং পরোক্ষ নরহত্যাচেষ্টা।

​ফেসবুকের নিউজফিড স্ক্রল করলে কিংবা পত্রিকার পাতা ওল্টালে প্রায়শই চোখে পড়ে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের খবর। কোনো কোনো ঘটনায় ট্রেনের কাচ ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়, আবার কোনো কোনো ঘটনায় চিরতরে নিভে যায় কোনো তরতাজা প্রাণ।

সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন আয়কর আইনজীবী চোখের আলো হারিয়েছে, এবং অপর একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। কয়েক বছর আগে রেল কর্মকর্তা আল আমিনের মর্মান্তিক মৃত্যু কিংবা কোনো প্রবাসীর চোখের আলো হারিয়ে ফেলার ঘটনাগুলো আমরা ভুলে যাইনি।

​সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, একটি চলন্ত ট্রেনের গতিবেগ যখন ঘণ্টায় ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বা তার বেশি থাকে, তখন সামান্য ওজনের একটি ছোট পাথরও বুলেটের মতো গতি ও শক্তি লাভ করে। এই পাথর যখন ট্রেনের জানালা ভেদ করে কোনো যাত্রীর মাথায় বা চোখে আঘাত করে, তখন মৃত্যু বা চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করা ছাড়া উপায় থাকে না। অথচ, যে ব্যক্তি বা শিশুটি আনন্দের ছলে পাথরটি ছুড়েছিল, সে হয়তো বাড়ি ফিরে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে!

​অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনার সিংহভাগেরই নেপথ্যে থাকে রেললাইনের আশেপাশের বস্তি বা এলাকার শিশু-কিশোররা। সচেতনতার অভাব এবং সঠিক পারিবারিক শিক্ষার অভাবে তারা একে এক ধরনের ‘রোমাঞ্চকর খেলা’ মনে করে। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে মাদকাসক্ত তরুণ এবং স্থানীয় বখাটেদেরও এই অপরাধে লিপ্ত হতে দেখা যায়। কিন্তু অপরাধী শিশু হোক বা প্রাপ্তবয়স্ক, এর পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেই বোধটাই তাদের মাঝে অনুপস্থিত।

​চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের এই সংস্কৃতি রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভব নয়, তবে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একে অবশ্যই নির্মূল করা সম্ভব। বাংলাদেশে রেলওয়ে আইন অনুযায়ী, চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুড়লে কঠোর শাস্তি এবং জরিমানার বিধান রয়েছে। এমনকি এর কারণে যদি কারও মৃত্যু হয়, তবে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রয়েছে। এই আইনের ব্যাপক প্রচার এবং অপরাধীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

রেললাইনের আশেপাশের এলাকার অভিভাবক, স্কুল ও ধর্মীয় উপাসনালয়ের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সন্তানদের বোঝাতে হবে যে, তাদের ছোঁড়া একটি পাথর অন্য একটি পরিবারের সারাজীবনের কান্নার কারণ হতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে রেলওয়ে পুলিশের টহল বাড়াতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির অংশ হিসেবে ট্রেনের ইঞ্জিনে বা সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা যেতে পারে, যেন অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করা যায়। ট্রেনের জানালাগুলোতে বুলেটপ্রুফ গ্লাস বা শক্তিশালী নেট (জাল) ব্যবহার করা যেতে পারে, যাতে পাথর সরাসরি ভেতরে আসতে না পারে।

​একটি সভ্য সমাজে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের মতো বর্বরতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ট্রেন কোনো আনন্দ ভ্রমণের কিংবা পাথর ছোঁড়ার লক্ষ্যবস্তু নয়; এটি লাখো মানুষের জীবনের সাথে জড়িত। শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না, সমাজ থেকে এই ব্যাধি দূর করতে আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে।

​পরবর্তী যাত্রায় যেন কোনো মায়ের বুক খালি না হয়, কোনো সন্তান যেন তার বাবাকে না হারায়—সেজন্য আজই চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সময়। আসুন, একটি নিরাপদ ও পাথরযুক্ত বা টেনশনমুক্ত রেলপথ গড়ে তুলি।

আদিত্ব্য কামাল, সম্পাদক জনতার খবর