নিজস্ব প্রতিবেদক : ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি এখন চরমে। সেবা নিতে এসে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, অন্যদিকে উৎকোচ দিয়ে দালাল বা তথাকথিত ‘চ্যানেল’ ধরলেই সহজে মিলছে কাঙ্ক্ষিত সেবা। জালিয়াতি ও অনিয়মই যেন এই অফিসের প্রধান নিয়মে পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধান ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পাসপোর্ট অফিসের এই বিশালাকার সিন্ডিকেটটি সরাসরি পরিচালনা করছেন অফিসেরই কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। অফিসের কর্মকর্তাদের ছত্রচ্ছায়ায় খোকন, জহির ও মিজান নামের তিন জন বহিরাগত (বেসরকারি) স্টাফ পুরো সিন্ডিকেট পরিচালনা করছে। তাদের মূল কাজ হলো দালালদের আনা ফাইলগুলো সংগ্রহ ও নিখুঁত হিসাব রাখা। আবেদনের ফর্মে বিশেষ ‘কোড নাম্বার’, ‘মেইল আইডি’ বা নির্দিষ্ট গোপন চিহ্ন দেখে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বুঝে নেন ফাইলটি কোন দালালের। এই কোড প্রতি মাসেই বদলে ফেলা হয়।
প্রতিদিন সন্ধ্যার পর উপপরিচালকের কক্ষ থেকেই পরবর্তী দিনের নির্দেশাবলী ও কৌশল নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে প্রায় ২১টি নির্দিষ্ট ‘চ্যানেলে’র মাধ্যমে পাসপোর্ট অফিসে অবৈধ ফাইল জমা হয়। দালালরা সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে পাসপোর্ট প্রতি ২ থেকে ৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত আদায় করে। প্রতিটি পাসপোর্টের বিপরীতে অফিসের ভেতরে দিতে হয় ১,৫০০ টাকা। সহকারী হিসাবরক্ষক জয়নাল ও বহিরাগত স্টাফরা এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ লেনদেন ও ভাগবাঁটোয়ারার দায়িত্ব সামলান।
যারা নিয়ম মেনে নিজে আবেদন জমা দিতে আসেন, তাদের দালালদের শরণাপন্ন হতে বাধ্য করতেই পরিকল্পিত ভোগান্তি তৈরি করা হয়। ১০৫ নম্বর রুমের কর্মকর্তা মোর্শেদুল হক ও তার সহযোগী নারী কর্মকর্তা নিগার সুলতানা সাধারণ গ্রাহকদের ফর্মে গোল দাগ দিয়ে পেশাগত অসংগতির বাহানা তোলেন। ‘ওপরে স্যারের রুমে যান’, ‘সার্ভার সমস্যা’, ‘আজ কাজ হবে না’, বা ‘কাগজ কম আছে’—এমন অজুহাতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষকে এক রুম থেকে অন্য রুমে ঘুরিয়ে নাজেহাল করা হয়।
গত ২৩ জুলাই সরকারি এই প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে ঘুষবাণিজ্য ও গ্রাহক হয়রানির খবরে সম্প্রতি জেলা পরিষদ প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম সিরাজ সরেজমিনে পরিদর্শনে গেলে কয়েক জন ভুক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন অফিস কর্মকর্তারা অনেক দুর্ব্যবহার করেন পাসপোর্ট করতে আসা সাধারণ নাগরিকদের সাথে। এবং তিনি নিজেও দেখেন যে অনেকজনকে হয়রানি করা হচ্ছে, যাদেরকে বলা হয়েছিল ৩ দিন পরে আসার জন্য, পরে তিনি বলেন যা এখন করা যায় তা ৩ দিন পরে কেন! অনেকেই তো দূর থেকে আসেন। পরে তাঁর হস্ত্যক্ষেপে কয়েক জনকে সহজে কাজ সম্পন্ন করে দেওয়া হয়।
পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, “আমরা যখন পরিদর্শনে যাই এবং সেখানে উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে কথা বলি, তখন তাদের চেহারায় স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ লক্ষ্য করি। তারা আমাদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে পারছিলেন না এবং স্বাভাবিক আচরণও করতে পারছিলেন না।
পাসপোর্ট করতে আসা আশুগঞ্জের বাসিন্দা তারেকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অনলাইন হয়নি বলে দুই দিন পর আসতে বলা হয়েছিল। কাজ ফেলে এত দূর থেকে আসা সম্ভব নয় জানালেও তারা কথা শোনেনি। শেষে পরিচিত এক বড় ভাইকে দিয়ে বলাতেই মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে যায়।”
বাঞ্ছারামপুরের মো. রনি মিয়া বলেন,”ভেতরের কর্মচারীরা অত্যন্ত ধীরগতিতে কাজ করে এবং লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখে মানুষকে একবার ওপরে, একবার নিচে পাঠায়।”
নাসিরনগরের মো. খাইরুল ইসলাম জানান, “সকাল ৯টায় আসার পর ১০৫ নম্বর রুমের একজন কর্মচারী ২ হাজার টাকা দাবি করে। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় হয়রানি করা হয়। পরে এক সাংবাদিকের হস্তক্ষেপে কাজটি হয়।”
সার্বিক অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ প্রসঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবির জানান, অফিসে কিছু অনিয়ম থাকার কথা তিনি স্বীকার করছেন তবে তা গুছিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, “প্রতিদিন নিজে লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষের কথা শুনি এবং সপ্তাহে একদিন গণশুনানির আয়োজন করছি। আবেদন ফর্মে কোনো অবৈধ কোড বা অন্যের ইমেইল ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা তদন্ত করে অসংগতি পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”