নিজস্ব প্রতিবেদক : মাদক, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গড়তে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ সামাজিক আন্দোলন। তরুণ প্রজন্মকে বিপথগামী হওয়া থেকে বাঁচাতে সন্ধ্যার পর অপ্রয়োজনে ছাত্রদের বাড়ির বাইরে না থাকার বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যথায় সন্ধ্যার পর বাইরে অকারণে ঘোরাঘুরি করলে ছাত্রদের পুলিশ ও ডিবির (গোয়েন্দা পুলিশ) হাতে পড়তে হবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাত সাড়ে ৯টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের পৌর আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সদর মডেল থানার আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক বিশাল মাদকবিরোধী সমাবেশে এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন বক্তারা। সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল। এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন এবং সভাপতিত্ব করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ মো. আবদুর রউফ। প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল বলেন, “সমাজ ও পরিবারের শান্তি রক্ষা করতে হলে সবার আগে মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হবে। সীমান্ত দিয়ে যাতে কোনোভাবেই মাদক প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবকে আরও কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।” তিনি অভিভাবকদের সতর্ক করে বলেন, “সন্ধ্যার পর ছাত্ররা যাতে অপ্রয়োজনে বাসার বাইরে না থাকে, সেদিকে অভিভাবকদের কড়া খেয়াল রাখতে হবে। সন্ধ্যার পর যারা অপ্রয়োজনে বাইরে থাকবে, তাদের বিষয়ে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নজরদারি বাড়াতে হবে।” এছাড়া মাদক মামলার আসামিদের দ্রুত জামিন পাওয়ার সুযোগ কমিয়ে আনতে আইনজীবীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। পুলিশ সুপার শাহ মো. আবদুর রউফ তার বক্তব্যে বলেন, “মাদক, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাস নির্মূলে শুধু পুলিশের অভিযান দিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের সন্তানদের অপরাধ থেকে দূরে রাখার প্রথম দায়িত্ব পরিবারের। তাই সমাজের প্রতিটি শ্রেণি পেশার মানুষকে এ লড়াইয়ে যুক্ত হতে হবে।” ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে শান্তিপূর্ণ জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন। সমাবেশে জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম মাদকাসক্তদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে আধুনিক সুযোগ সুবিধাসম্পন্ন রিহ্যাবিলিটেশন (পুনর্বাসন) কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি জানান। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব খাটিয়ে কেউ যাতে মাদক ব্যবসা চালাতে না পারে, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। জামায়াতে ইসলামীর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আমির মাওলানা মোবারক হোসাইন বলেন, “সব ধর্মীয় গ্রন্থেই মাদক সেবন ও ব্যবসাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মাদক সমাজের জন্য এক ভয়াবহ অভিশাপ।” তিনি দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাইনুল ইসলাম চপলের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন র্যাব-৯-এর কোম্পানি কমান্ডার মো. নুরুন্নবী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাজেদুল হাসান, এনসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আতাউল্লাহ, জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি জহিরুল ইসলাম খোকন, সাবেক পৌর মেয়র হাফিজুর রহমান মোল্লা কচিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং সাংবাদিকরা। এছাড়া মাদক সমস্যার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে বক্তব্য দেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মনির হোসেন, ‘ঐক্যবদ্ধ সদর ব্রাহ্মণবাড়িয়া’র পরিচালক আরিফ বিল্লাহ আজিজী এবং ‘মাদকমুক্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া চাই’ সংগঠনের মাহফুজুর রহমান পুষ্প। সমাবেশ শেষে বক্তারা একমত পোষণ করে জানান সীমান্তপথে মাদক প্রবেশ বন্ধ, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, পরিবারের নজরদারি বৃদ্ধি, মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন এবং মহল্লায় মহল্লায় কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি গঠন; এই ছয়টি বিষয়ের যথাযথ বাস্তবায়ন ছাড়া মাদকমুক্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া গড়া কঠিন।