নদীর কোলঘেঁষা বিপন্ন এক প্রাণবন্ধু: বিশ্ব ভোঁদড় দিবস

সাহিত্য, 1 July 2026, 10 বার পড়া হয়েছে,
ছোটবেলার বহু স্মৃতি হয়তো ধুলোবালি জমে আবছা হয়ে যায়, কিন্তু কিছু কিছু ছড়া মনের কোণে এমনভাবে খোদাই করা থাকে যা কখনোই মলিন হয় না। “আয় রে আয় টিয়ে, নায়ে ভরা দিয়ে…”— এই লাইনগুলো কানে আসবামাত্রই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক চিলতে সোনালী অতীত।
​ছোটবেলায় যখন একদমই ঘুমাতে চাইতাম না, ছটফট করতাম, তখন মা কিংবা দাদী-নানী কোলবালিশে মাথাটা দিয়ে এই ছড়াটি শোনাতেন। সুর করে করে যখন বলতেন, “না নিয়ে গেল বোয়াল মাছে, তাই না দেখে ভোঁদড় নাচে!”—তখন চোখের সামনে যেন এক রূপকথার জগৎ ভেসে উঠতো। একটা মাছ নৌকা নিয়ে চলে যাচ্ছে, আর তাই দেখে একটা ভোঁদড় মনের সুখে নাচছে—কেমন অদ্ভুত আর মজার এক কল্পনা! সেই কাল্পনিক নদীর পাড়ে হারিয়ে যেতে যেতে কখন যে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসতো, টেরো পেতাম না।
​তখনকার দিনের ছড়ার বইগুলোর কথা মনে আছে? পাতাজুড়ে বড় বড় রঙিন ছবি থাকতো। একটা টিয়া পাখি নৌকায় বসে আছে, একটা বড় বোয়াল মাছ আর একটা ভোঁদড় দুই পায়ে দাঁড়িয়ে নাচছে। ওই ছবিটা দেখে দেখে স্লেটে বা খাতার পাতায় আঁকিবুঁকি করার চেষ্টা করিনি এমন মানুষ বোধহয় কমই আছে। যদিও আমার আঁকা ভোঁদড়টা দেখতে বিড়ালের মতো হতো, আর বোয়াল মাছটা হতো একটা এবড়োথেবড়ো গোল্লা!
​ছড়াটির শেষ লাইনটা ছিল সবচেয়ে জাদুকরী— “ওরে ভোঁদড় ফিরে চা, খোকার নাচন দেখে যা।”
বাসার বড়রা যখন এই লাইনটা বলতেন, আমরা ছোটরা তখন সত্যি সত্যিই কোমর দুলিয়ে নাচতে শুরু করতাম। আমাদের সেই বেঢপ, মিষ্টি নাচন দেখে মা-বাবা হেসেই খুন হতেন। তখন আনন্দ পাওয়ার জন্য কোনো দামি খেলনা বা স্ক্রিনের প্রয়োজন হতো না; চার লাইনের একটা ছড়াই পুরো ঘরকে হাসিখুশিতে ভরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
আজ যখন যান্ত্রিক জীবনের ইঁদুরদৌড়ে আমরা সবাই ব্যস্ত, তখন হুট করে এই ছড়াগুলো শুনলে বুকটা কেমন যেন হু হু করে ওঠে। শৈশবের সেই নিষ্পাপ সরলতা, মায়ের মুখের সেই মিষ্টি সুর আর কোনো দায়-দায়িত্বহীন সোনালী দিনগুলো যেন এই ছড়ার লাইনের আড়ালেই লুকিয়ে আছে।
​নদীর ধারে বা বিলের জলে হঠাৎ টুপ করে ডুব দিয়ে মুখে একটা রূপালি মাছ নিয়ে ভেসে ওঠা চঞ্চল, বুদ্ধিমান প্রাণীটির নাম ভোঁদড়। একসময় আমাদের গ্রামবাংলার নদী, নালা, হাওর আর খালের পাড়ে এদের প্রায়ই দেখা যেত। কিন্তু কালের বিবর্তনে এই চেনা দৃশ্যটি আজ অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। প্রতি বছর মে মাসের শেষ বুধবার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব ভোঁদড় দিবস’। এই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো— প্রকৃতির এই অনন্য কারিগরদের রক্ষায় সচেতনতা তৈরি করা এবং তাদের অস্তিত্বের সংকটগুলো সবার সামনে তুলে ধরা।
​ভোঁদড় কেবলই একটি জলচর প্রাণী নয়, এরা জলজ বাস্তুতন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। পরিবেশবিদরা এদের পরিবেশের সুস্বাস্থ্যের নির্দেশক বলে থাকেন। ভোঁদড় প্রধানত মাছ, কাঁকড়া ও জলজ পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে। এরা শিকারী প্রাণী হওয়ায় জলাশয়ের অসুস্থ ও দুর্বল মাছগুলো আগে ধরে খায়। ফলে মাছের মহামারী বা রোগব্যাধি ছড়ানোর সুযোগ কমে যায় এবং সুস্থ মাছের বংশবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়।
ভোঁদড়ের উপস্থিতি প্রমাণ করে সেই জলাশয়ের পানি পরিষ্কার এবং সেখানে পর্যাপ্ত খাদ্য আছে। অর্থাৎ, ভোঁদড় ভালো থাকা মানে আমাদের নদী-নালা ভালো থাকা।
​আইইউসিএন -এর লাল তালিকা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে থাকা ১৩ প্রজাতির ভোঁদড়ের প্রায় প্রতিটিই কম-বেশি হুমকির মুখে। বাংলাদেশে মূলত তিন প্রজাতির ভোঁদড় দেখা যেত— ইউরেশীয় ভোঁদড়, মসৃণ-লোমশ ভোঁদড় এবং ছোট-নখযুক্ত ভোঁদড়। তবে বর্তমানে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। নদী দখল, জলাভূমি ভরাট এবং নির্বিচারে বনাঞ্চল ধ্বংসের কারণে এরা মাথা গোঁজার ঠাঁই হারাচ্ছে। কলকারখানার বর্জ্য, কীটনাশক এবং প্লাস্টিক দূষণের কারণে জলাশয়ের মাছ কমে যাচ্ছে, যা ভোঁদড়দের খাদ্য সংকটে ফেলছে। পাশাপাশি দূষিত পানির কারণে এরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক সময় মাছের ঘের বা পুকুরে ঢুকে মাছ খাওয়ার অপরাধে মানুষ এদের পিটিয়ে মেরে ফেলে। এদের নরম ও মূল্যবান চামড়ার জন্য আন্তর্জাতিক চোরাবাজারে ভোঁদড়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, যা এদের শিকারের অন্যতম বড় কারণ।
​বাংলাদেশের নড়াইল এবং খুলনা অঞ্চলের কিছু জেলে পরিবার শত শত বছর ধরে ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকারের এক অনন্য ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছে। পোষা ভোঁদড়রা জাল দিয়ে মাছ তাড়িয়ে জেলেদের নৌকার দিকে নিয়ে আসে। এটি মানব ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থানের এক চমৎকার ঐতিহাসিক উদাহরণ। তবে উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা, নদী দূষণ এবং মাছের স্বল্পতার কারণে এই ঐতিহ্যবাহী পেশার সাথে জড়িত মানুষেরা যেমন হারিয়ে যাচ্ছেন, তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে এই পোষা ভোঁদড়গুলোও।
​বিশ্ব ভোঁদড় দিবসে কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আমাদের কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি: ভোঁদড়দের প্রাকৃতিক আবাসস্থল বা ব্রিডিং গ্রাউন্ডগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোকে সুরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। নদী ও হাওরের পানি দূষণমুক্ত রাখতে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। স্থানীয় জনগণ ও জেলেদের বোঝাতে হবে যে ভোঁদড় শত্রু নয়, বরং মাছের উৎপাদন বাড়াতে এরা প্রকৃতির এক নীরব সহযোগী।
​ভোঁদড় হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি প্রাণীর বিলুপ্তি নয়, বরং আমাদের নদী ও জলাশয়গুলোর জীবনীশক্তি হারিয়ে যাওয়া। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবী রেখে যেতে হলে প্রকৃতির এই চঞ্চল, সুন্দর প্রাণীদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। বিশ্ব ভোঁদড় দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক— “সুস্থ থাকুক জলাভূমি, সুরক্ষিত থাকুক ভোঁদড়।”।
আদিত্ব্য কামাল, সম্পাদক জনতার খবর