আদিত্য কামাল : আজ ১১ জুলাই। বাংলা কবিতার বাঁক বদলানো কারিগর, লোকজ ঐতিহ্যের কালজয়ী রূপকার কবি আল মাহমুদের ৯০তম জন্মবার্ষিকী। আল মাহমুদের প্রকৃত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের আকাশে তিনি এমন এক দেদীপ্যমান নক্ষত্র, যিনি মাটির গন্ধ, নদীর কলতান আর গ্রামীণ জীবনের রূপ-রস-গন্ধকে আধুনিক কবিতার পঙক্তিতে এক অনন্য শিল্পরূপ দিয়েছেন। জীবনানন্দ দাশের পর প্রকৃতির এমন অকৃত্রিম চিত্রায়ণ আর কেউ করতে পেরেছেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে, তবে আল মাহমুদ যে তাঁর নিজস্বতায় অনন্য—তাতে কোনো সংশয় নেই।
আল মাহমুদের কবিতার মূল শক্তি ছিল তাঁর শেকড়-সন্ধানী দৃষ্টি। ১৯৩৬ সালের এই দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোড়াইল গ্রামে জন্ম নেওয়া এই কবি শহরকেন্দ্রিক নাগরিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাননি। বরং তিনি তাঁর স্মৃতির ঝুলি থেকে তুলে এনেছেন তিতাস নদীর অববাহিকা, চরের জীবন, আর গ্রামীণ মানুষের সুখ-দুঃখের আখ্যান।
এখানে আমার একটি ব্যক্তিগত আবেগের জায়গা জড়িয়ে আছে। কবির বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোড়াইল গ্রামে, আর আমার নিজের শেকড় ও বাড়ি ঠিক একই শহরতলীর ভাদুঘর গ্রামে। শৈশব থেকে একই মাটির গন্ধ মেখে, একই তিতাসের হাওয়া গায়ে লাগিয়ে বড় হওয়ার কারণে আল মাহমুদের কবিতার নদী, চিল, মাছরাঙা কিংবা চরের জীবন আমার কাছে কেবল কাগজের শব্দ নয়; বরং এক জীবন্ত অনুভূতি। একই জনপদের সন্তান হিসেবে তাঁর সৃষ্টিকে স্পর্শ করা আমার কাছে এক পরম গৌরব ও আত্মিক আনন্দের বিষয়।
তাঁর কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ ‘সোনালী কাবিন’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। গ্রামীণ রূপক, লোকজ শব্দ এবং চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতির মিথকে তিনি যেভাবে আধুনিক চেতনার সাথে যুক্ত করেছেন, তা এক কথায় বিস্ময়কর। সোনালী কাবিনের সনেটগুলোতে প্রেম, সমাজ আর দ্রোহের যে অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে, তা যুগে যুগে পাঠককে মোহিত করে চলেছে।
”নদীর সেচনে যদি শস্যের সুবাসে ভরে ওঠে। তবে তোমাকেও আমি পেতে পারি শস্যের শরীরে…”
আল মাহমুদ শুধু লোকজ কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন লোকজ ঐতিহ্যের আধুনিক রূপকার। তাঁর ‘লোক লোকান্তর’, ‘কালের কলস’, কিংবা ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ কাব্যগ্রন্থগুলো পরখ করলে দেখা যায়, তিনি গ্রামীণ উপমা ও শব্দকে এমন এক নাগরিক আভিজাত্য দিয়েছেন, যা বাংলা কবিতায় আগে বেশ দুর্লভ ছিল। চিল, মাছরাঙা, হিজল গাছ কিংবা বর্ষার কাদা-জল তাঁর কলমের ছোঁয়ায় হয়ে উঠেছে শাশ্বত সৌন্দর্যের প্রতীক।
একই সাথে তাঁর গদ্য সাহিত্য—বিশেষ করে ‘পানকৌড়ির রক্ত’ কিংবা ‘উপমহাদেশ’ উপন্যাসেও তিনি সেই চেনা জনপদ আর মানুষের মনস্তত্ত্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত নিপুণভাবে।
শুধু সাহিত্য সাধনায় নয়, আল মাহমুদ জড়িয়ে ছিলেন এদেশের ইতিহাসের বাঁকবদলের সাথেও। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং প্রবাসী সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে যুক্ত থেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তাঁর সাহসী সাংবাদিকতা ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর পরিচালক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এই মহান কবি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু কবিদের তো মৃত্যু হয় না, তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের সৃষ্টির মাঝে। আজ তাঁর ৯০তম জন্মবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে আমরা যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি বাংলা কবিতার পরিধিকে তিনি কতটা সমৃদ্ধ করে গেছেন।
যান্ত্রিক এই যুগে, যখন মানুষ দিন দিন তার শেকড় ভুলে যাচ্ছে, তখন আল মাহমুদের কবিতা আমাদের বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় মায়ের কোলে, মাটির গন্ধে, নদীর কলতানে। আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার, আমাদের তিতাস পাড়ের এই কালজয়ী রূপকারকে তাঁর জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। কবি, আপনি বেঁচে আছেন এবং থাকবেন বাঙালির হৃদয়ে, তিতাসের ঢেউয়ে আর সোনালী কাবিনের প্রতিটি অক্ষরে।