মহাকাশ জয় নাকি নিষ্ঠুরতা: লাইকার বলিদানের শিক্ষা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া, 4 November 2026, 14 বার পড়া হয়েছে,

৩ নভেম্বর মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিজ্ঞানের জয়যাত্রার পেছনের এক নিষ্ঠুর ও হৃদয়বিদারক অধ্যায়ের স্মারক দিন। ১৯৫৭ সালের এই দিনে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাশূন্যে পাঠায় লাইকা নামের একটি ছোট্ট পথকুকুরকে। মহাকাশ জয়ের উন্মাদনায় সেদিন এক নির্বাক প্রাণীর বিশ্বাসের সাথে যে চরম প্রতারণা করা হয়েছিল, তা আজও মানববিবেককে নাড়া দেয়।

​দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর স্নায়ুযুদ্ধের যুগে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন—দুই পরাশক্তি মেতে উঠেছিল এক সর্বগ্রাসী প্রতিযোগিতায়। শিল্প, বিজ্ঞান, সমরাস্ত্র থেকে শুরু করে মহাকাশ দখল—সবক্ষেত্রেই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের ইঁদুরদৌড় শুরু হয়। এই প্রতিযোগিতারই বলি হয়েছিল লাইকা।

​১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর ‘স্পুটনিক-১’ সফলভাবে মহাকাশে পাঠিয়ে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। এরপর বলশেভিক বিপ্লবের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে তৎকালীন নেতা নিকিতা ক্রুশেভ এমন এক চমক চান, যা আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে। বিজ্ঞানীরা বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে, মাত্র ৪০ দিনে মহাকাশযান তৈরি এবং কোনো প্রাণীকে নিরাপদে পাঠানোর কাজটি অসম্ভব। কিন্তু রাজনৈতিক চাপে বিজ্ঞানকে বলি দেওয়া হলো। তৈরি হলো ‘স্পুটনিক-২’।

​স্পুটনিক-২ মহাশূন্যে পাঠানোর পরিকল্পনাটি শুরু থেকেই ছিল একমুখী। যানটি মহাকাশে যাওয়ার উপযোগী হলেও পৃথিবীতে নিরাপদে ফিরে আসার কোনো প্রযুক্তি তাতে ছিল না। তাছাড়া তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার চরম ত্রুটির কারণে মহাশূন্যে পৌঁছানোর পর তীব্র গরমে এবং মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে অক্সিজেনের অভাবে লাইকার মৃত্যু যে অবধারিত, তা জেনেশুনেই এই আত্মঘাতী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

​মস্কোর কোনো এক রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনা ছোট্ট লাইকাকে মাত্র দুই সপ্তাহ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যে কুকুরটি মানুষের ভালোবাসা পেয়েছিল, মানুষ সেই বিশ্বাসের প্রতিদান দিল তাকে একটি রকেটের বন্দিদশায় তুলে দিয়ে। ৩ নভেম্বর যখন ক্যাপসুলের গ্লাস পাল্লা বন্ধ করা হলো, তখন হয়তো ছোট্ট লাইকাও ভাবেনি যে এই অন্ধকার তার চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার শুরু। রকেটের প্রচণ্ড শব্দ, কম্পন আর মহাকাশযানের সাথে বায়ুমণ্ডলের ঘর্ষণে তীব্র গরমে কিছুক্ষণের মধ্যেই নিভে যায় সেই প্রাণ।

​লাইকার করুণ মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রগতির নামে মানবজাতি কতখানি নিষ্ঠুর হতে পারে। মহাকাশ জয় আজ অনেক দূর এগিয়েছে, কিন্তু সেই জয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল একটি অবলা প্রাণীর রক্তের ওপর।

​আজকের দিনে আমাদের শপথ নেওয়া উচিত—বিজ্ঞান কিংবা প্রযুক্তির কোনো অর্জনের জন্যই যেন আর কোনো পশুপাখিকে এ ধরনের নির্মম বলির শিকার হতে না হয়। মহাশূন্যের কোনো এক কোণে তারার আলোয় ভালো থেকো লাইকা। তোমার চোখের সেই বিশ্বাসের সরলতা আমাদের ক্ষমা করুক।

– আদিত্য কামাল, সম্পাদক ও লেখক।