বিস্মৃতির অন্তরালে পল্লী-প্রকৃতির নিপুণ কারিগর: বন্দে আলী মিয়া

সাহিত্য, 28 June 2026, 9 বার পড়া হয়েছে,

“আমাদের ছোট গাঁয়ে ছোট ছোট ঘর, থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেহ পর…”

​শৈশবের পাঠ্যবইয়ের এই অমর পঙক্তিমালা পড়েনি, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দায়। গ্রামীণ সৌহার্দ্য ও সহজ-সরল জীবনের এমন নিখুঁত ছবি যিনি আমাদের মনে এঁকে দিয়েছিলেন, তিনি বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী কবি বন্দে আলী মিয়া। অথচ আজ বড় বেদনার সাথে বলতে হয়, বাংলা সাহিত্যের এই কালজয়ী স্রষ্টা অনেকটাই যেন হারিয়ে গেছেন আমাদের চর্চা আর স্মৃতির অন্তরাল থেকে।

​বন্দে আলী মিয়া কেবল একজন কবিই ছিলেন না; তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক, নাট্যকার এবং একজন দক্ষ চিত্রকর। ১৯০৬ সালের ১৭ জানুয়ারি পাবনার রাধানগর গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি প্রকৃতির রূপ বর্ণনায় ছিলেন এক অনন্য কারিগর। পাবনার মজুমদার একাডেমি থেকে ১৯২৩ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর তিনি কলকাতা আর্ট একাডেমিতে ভর্তি হন এবং প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। সাহিত্যের পাশাপাশি তাঁর এই শৈল্পিক সত্তা তাঁকে পত্রপত্রিকায় চিত্রকর ও ব্লক কোম্পানির ডিজাইনার হিসেবে কাজ করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।

​কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে দীর্ঘ দেড় দশক (১৯৩০-১৯৪৬) শিক্ষকতা করা বন্দে আলী মিয়া তাঁর কলকাতা জীবনেই প্রায় ২০০টি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। সে সময় কলকাতার সাহিত্য আকাশে তিনি সান্নিধ্য পেয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের। দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা বেতারে যোগ দেন। ১৯২৫ সালে ‘ইসলাম দর্শন’ পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল।

​তাঁর সাহিত্যসম্ভার বিপুল ও বৈচিত্র্যময়: ​কাব্যগ্রন্থ: ‘ময়নামতির চর’ (১৯৩২), ‘অনুরাগ’ (১৯৩২), ‘পদ্মানদীর চর’, ‘ধরিত্রী’, ‘মধুমতীর চর’ (১৯৫৩) এবং ‘শেষ লগ্ন’ (১৯৪১)। ​উপন্যাস: ‘অরণ্য’, ‘গোধূলী’, ‘ঝড়ের সংকেত’, ‘নীড়ভ্রষ্ট’, ‘জীবনের দিনগুলো’ এবং ‘বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’। নাটক ও গল্প: নাটক ‘মসনদ’ (১৯৩১) এবং গল্পগ্রন্থ ‘তাসের ঘর’ (১৯৫৪)।

​বন্দে আলী মিয়ার সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত আমাদের শিশুসাহিত্যে। ‘কুঁচবরণ কন্যা’ (১৯৬১), ‘চোর জামাই’, ‘মেঘকুমারী’, ‘বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা’, ‘মৃগপরী’, ‘বোকা জামাই’, ‘সোনার হরিণ’, ‘শিয়াল পণ্ডিতের পাঠশালা’ কিংবা ‘সাত রাজ্যের গল্প’—এরকম অসংখ্য সৃষ্টি আজও ছোটদের কল্পনার জগৎকে রঙিন করে রাখে। শিশুসাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৬২ সালে লাভ করেন ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’।

​জীবনদশায় তিনি কুড়িয়েছেন বহু সম্মাননা। প্রেসিডেন্ট পুরস্কার (১৯৬৫), প্রাইড অফ পারফরম্যান্স (১৯৬৭), এবং উত্তরা সাহিত্য মজলিস পদক (১৯৭৭)-এ ভূষিত হন তিনি। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’-এ সম্মানিত করে।

​১৯৭৯ সালের ২৭ জুন রাজশাহীতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান সাধক।

গান, গল্প, কবিতা, নাটক, স্মৃতিকথাসহ সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় যার অবাধ বিচরণ ছিল, সেই মা-মাটি-মানুষের কবি আজ বড় বেশি উপেক্ষিত। তাঁর সৃষ্টির আলোয় আলোকিত হয়েছে গোটা বাংলা, অথচ কালক্রমে তিনি নিজেই ঢাকা পড়ে যাচ্ছেন বিস্মৃতির ধুলোয়। নতুন প্রজন্মের কাছে বন্দে আলী মিয়ার কালজয়ী সৃষ্টিগুলোকে পৌঁছে দেওয়া এবং যোগ্য মর্যাদায় তাঁকে স্মরণ করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। শৈশবের সেই ‘ছোট গাঁয়ের’ চেনা রূপটি টিকিয়ে রাখতে হলেও বন্দে আলী মিয়াকে আমাদের মনে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

আদিত্ব্য কামাল, সম্পাদক জনতার খবর