বিবাহবিচ্ছেদ বেশি চান নারীরা

সারাদেশ, 24 September 2023, 109 বার পড়া হয়েছে,
নিউজ ডেস্ক : আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে বিবাহবিচ্ছেদ (ডিভোর্স) বাড়ছে। এই দৌড়ে এগিয়ে নারীরা। পুরষশাসিত সমাজব্যবস্থায় সাংসারিক জীবনে শান্তি খুঁজে না পেয়ে বিচ্ছেদের প্রবণতার দিকে ঝুঁকছে নারীরা। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীরাই ডিভোর্স চেয়ে আবেদন করেছেন বেশি।
শুধু ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের পরিসংখ্যান নয়, সারাদেশেই একই চিত্র বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তা-চেতনা, বোধেরও পরিবর্তন ঘটছে। যে কারণে বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনা বেড়েই চলছে বলে জানান বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ধীরে ধীরে এমন পর্যায়ে চলে যাবে যখন মানুষ আর ডিভোর্সকে খারাপ চোখে দেখবে না। এটা এক সময় স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে যাবে।

সিটি করপোরেশনে তালাক আবেদনগুলোর মধ্যে অনেক ডিভোর্স নোটে দেখা গেছে, নারীরা তাদের আবেদনে লিখেছেন মতের অমিল, বনিবনা হচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে লেখা আছে স্বামীর বিবাহবহির্ভূত অবৈধ সম্পর্ক এবং শারীরিক অক্ষমতা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ডিভোর্সের আবেদন করেছেন তানিয়া (ছদ্ম নাম) নামের এক নারী। সামাজিক মর্যাদার কারণে নামটি প্রকাশ করা হয়নি। তার বিয়ে হয়েছে ৯ মাস আগে। তিনি লিখিছেন, বিয়ের পর কিছুদিন যেতেই স্বামীর ভেতর পরিবর্তন লক্ষ করেছেন। স্বামী তাকে সময় দেন না। স্বামীকে অনেক সময় ধরে ফোনে কথা বলতে দেখেছেন। পরে তিনি জানতে পারেন তার স্বামী অন্য নারীর প্রেমে পড়েছেন। এ জন্য তিনি আর সংসার করতে চান না। এ রকম অসংখ্য আবেদন রয়েছে, যারা বিয়ের ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে ডিভোর্স চাচ্ছেন।

তবে বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদের প্রকৃত কারণ জানার পদ্ধতিটিও ত্রুটিপূর্ণ। বিচ্ছেদের আবেদনপত্রে মান্ধাতা আমলের ‘বনিবনা না হওয়া’, ‘মতের অমিল’, শারীরিক নির্যাতন’, যৌতুক’, ‘শারীরিক অক্ষমতা’, ‘অসুস্থতা’, ‘বিবাহবহির্ভূত অবৈধ সম্পর্ক’ ইত্যাদি গৎবাঁধা কারণ ছাপা থাকে। আবেদনকারী শুধু টিকচিহ্ন দিয়ে যান।

সিটি করপোরেশন থেকে দেওয়া আবেদন ফরম পূরণ করে প্রতিটি অঞ্চলে জমা দেওয়া হয়। এরপর সিটি করপোরেশন থেকে দুপক্ষকেই মীমাংসার জন্য ডাকা হয়। মীমাংসায় রাজি না হলে তখন ডিভোর্স হয়ে যায়। এভাবে প্রতিদিনই কোনো কোনো অঞ্চলে ডিভোর্সের আবেদন পড়ছে।

বিবাহবিচ্ছেদ বেড়ে যাওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আগে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিল। সেই ব্যবস্থাটা এখন আর ওইভাবে নেই। এখন মেয়েরাও নিজেদের ব্যক্তিত্ব, নিজেদের স্বাধীনতা, নিজেদের নিজস্বতা নিয়ে ভাবে। এখন আগের মতো কর্তৃত্ব মেনে নেয় না। এজন্যই এটা হচ্ছে। এটা বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যাপার নয়। এটা পৃথিবীময় হচ্ছে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কারণে প্রভাব পড়ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো নিশ্চয়ই কারণ। তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। নারীদের মধ্যে স্বাধীনতার বোধ এসেছে। ব্যক্তিস্বাধীনতার বোধ এসেছে। এর পেছনে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চয়ই আছে। সবচেয়ে বড় সম্পর্ক বন্ধুত্বের। বন্ধুত্বের সম্পর্ক না থাকলে এটা ঘটতেই থাকবে। এক সময় এটাকে লোকে আর খারাপ চোখে দেখবে না। এটা স্বাভাবিকভাবেই নেবে।

বিবাহবিচ্ছেদ বেড়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে মনোচিকিৎসক মোহিত কামাল বলেন, বিবাহবিচ্ছেদের কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম পারিবারিক সংঘাত আর পরকীয়া। পারিবারিক সংঘাতের মধ্যে মাদকাসক্তি কাজ করে। যেসব স্বামী মাদকাসক্ত, তারা নির্মম ও নিষ্ঠুর হয়। তাদের মধ্যে সন্দেহ রোগ সৃষ্টি হয়। তারা স্ত্রীদের সন্দেহ ও নির্যাতন করে। বাচ্চা থাকলে মেয়েরা চেষ্টা করে সংসার টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে তারা ডিভোর্সের জন্য যায়।

মেয়েরা বেশি ডিভোর্স চাচ্ছেন, তার কারণ ব্যাখ্যা করে এই মনোচিকিৎসক বলেন, মেয়েরা বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তাদের ইমোশনাল কষ্ট বেশি। তাই ডিভোর্সও বেশি। বাচ্চা না হলে দ্রুত তারা ডিভোর্সের দিকে যাচ্ছে। আর সেই সব মেয়েরা ডিভোর্স দেয়, যাদের বাবা-মার আর্থিক অবস্থা ভালো। তারা নিজেরাও কিছুটা স্বাবলম্বী। আর্থিকভাবে সচ্ছল বাবা-মা যখন দেখে, তাদের মেয়ে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তখন ডিভোর্স করিয়ে নিয়ে আসেন। এ রকম বহু ঘটনা আছে। আর একটা বড় কারণ ইদানীংকালে পরকীয়া খুব বেশি বেড়ে গেছে। পরকীয়া বেড়ে যাওয়ার কারণে পুরুষও ডিভোর্স দিচ্ছে, নারীরাও ডিভোর্স দিচ্ছে।

মোহিত কামাল বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, পুরুষরা বেশি পরকীয়া করছে। আর এই পরকীয়া বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগের ক্ষেত্র বেড়ে যাওয়া। হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, ফেসবুকে একটা ছেলে-মেয়ে যখন কথা বলছে, রীতিমতো অন্দরমহলে ঢুকে যাচ্ছে। শব্দ তরঙ্গ কানের মাধ্যমে ব্রেনে যাচ্ছে। ব্রেন আলোরিত হয়। ছেলেরা দ্রুত জেগে ওঠে, দ্রুত পটাতে থাকে। শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে পরকীয়া বেড়ে যাচ্ছে।

ডিভোর্স বিষয়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আরিফা রহমান বলেন, নারীদের ডিভোর্স সংখ্যায় বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে তারা এখন নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছে। অনেক ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। আর্থিক ও বিভিন্ন দিক দিয়ে নারীরা এগিয়ে যাওয়ার কারণে পুরুষরা তাদের আইডেন্টি সংকটে ভুগছে। ফলে ডিভোর্স বাড়ছে। নারীরা আর কর্তৃত্ব মানতে চায় না। এসব কারণেই নারীরা বেশি ডিভোর্স চান।

গত ৪ বছর ৮ মাসে ঢাকা সিটিতে ডিভোর্সের ঘটনা ঘটেছে ৫৭ হাজার ৩২৭টি। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিসংখ্যান বলছে, ৫০ হাজার ৯৬৭টি ডিভোর্সের মধ্যে নারীরা ডিভোর্স চেয়েছেন ৩৩ হাজার ৬১৮ জন। পুরুষের তুলনায় নারীদের ডিভোর্সের হার ২ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি।

২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত মোট তালাক হয়েছে ৫৭ হাজার ৩২৭টি। এর মধ্যে ২০১৯ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নারী, পুরুষ পৃথক করা হয়নি। দক্ষিণে ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত এবং উত্তর সিটির ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত মোট তালাকপ্রাপ্তদের মধ্যে নারী ৩৩ হাজার ৬১৮টি আর পুরুষ কর্তৃক তালাক হয়েছে ১৫ হাজার ৯৯৪টি।

চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ডিভোর্সের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জানুয়ারি মাসে স্ত্রী কর্তৃক তালাক ৪৫০টি, স্বামী কর্তৃক তালাক ২০০টি। এ মাসে মোট তালাক হয় ৬৫০টি। ফেব্রুয়ারি মাসে স্ত্রী কর্তৃক ৩৯৯টি ও স্বামী কর্তৃক ১৬৫টি মিলিয়ে মোট তালাক ৫৬৪টি। মার্চ মাসে স্ত্রী ৩২৮টি, স্বামী ১৪৮টি তালাক দেন। এ মাসে মোট তালাক ৪৭৬টি। এপ্রিলে স্ত্রী ২৭৯টি, স্বামী ১৪৯টি মিলিয়ে মোট তালাক ৪২৮টি। মে মাসে স্ত্রী ৫৭৭ ও স্বামী ১২৯টি মিলিয়ে মোট ৭০৬টি। জুন মাসে স্ত্রী ৫৮৯টি ও স্বামী ১১৯টি মিলিয়ে মোট তালাক ৭০৮টি। জুলাই মাসে স্ত্রী ৪৭৬টি ও স্বামী ২১৪টি মিলিয়ে মোট তালাক ৬৯০টি এবং আগস্ট মাসে স্ত্রী ৪৩৯টি ও স্বামী ২০৫টি। মোট তালাক ৬৪৪টি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত নারী কর্তৃক তালাকের সংখ্যা ২ হাজার ৫৯০টি এবং পুরুষ কর্তৃক তালাকের সংখ্যা ১ হাজার ২৯৬টি। এই ৭ মাসে মোট তালাক হয়েছে ৩ হাজার ৮৮৬টি।

ডিএনসিসি এলাকায় ২০২২ সালে মোট তালাক হয় ৫ হাজার ৬৩৯টি। তার মধ্যে নারী কর্তৃক তালাক ৩ হাজার ৬৩৭টি আর পুরুষ কর্তৃক তালাক ২ হাজার ২টি। ২০২১ সালে মোট তালাক ৫ হাজার ৮৪৩টি। এর মধ্যে নারী কর্তৃক ৪ হাজার ৮১টি আর পুরুষ কর্তৃক ১ হাজার ৭৬২টি। ২০২০ সালে মোট তালাক হয় ৬ হাজার ১৬৮টি। এর মধ্যে নারী কর্তৃক ৪ হাজার ৫৩টি, পুরুষ কর্তৃক ২ হাজার ১১৫টি। ২০১৯ সালে মোট তালাক হয় ৬ হাজার ১৪৪টি। এর মধ্যে নারী কর্তৃক তালাক ৩ হাজার ৮২৪টি এবং পুরুষ কর্তৃক তালাক ২ হাজার ৩২০টি।

দক্ষিণ সিটিতে ২০১৯ সালে মোট তালাক হয় ৬ হাজার ৩৬০টি। ২০২০ সালে মোট তালাক ৬ হাজার ৩৪৫টি। তার মধ্যে নারী কর্তৃক ৪ হাজার ৪২৮টি, পুরুষ কর্তৃক ১ হাজার ৯১৭টি। ২০২১ সালে মোট তালাক ৭ হাজার ২৪৫টি, যার মধ্যে নারী কর্তৃক ৫ হাজার ১৮৩টি, পুরুষ কর্তৃক ২ হাজার ৬২টি। ২০২২ সালে মোট তালাক ৭ হাজার ৬৯৮টি, যার মধ্যে নারী দিয়েছেন ৫ হাজার ৩৮৩টি এবং পুরুষ দিয়েছেন ২ হাজার ৩১৫টি।