১৬ এপ্রিল উল্লাসকর দত্তের জন্মদিন- আমির হোসেন

সাহিত্য, 16 April 2026, 3 বার পড়া হয়েছে,

তোমার প্রিয় জন্মভূমি কালিকচ্ছ ছেড়ে এই দেশান্তরেই কি তুমি শেষ জীবন কাটাতে পারবে দত্ত বাবু? জন্মভূমি না তোমার মা? মাকে ছেড়ে ভিন দেশে বসতি স্থাপনকে কি তুমি মনের দিক থেকে মেনে নিতে পারবে?

-আমার মাকে কী আর মা রেখেছে ওরা লীলা! ওরা তো আমার মাকে সাম্প্রদায়িক ব্রুজলি দ্বারা কাঁটাছেড়া করে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে গেছে। আর নিজের মায়ের কাঁটাছেড়ায় অংশ নিয়েছে এদেশের কংগ্রেস-মুসলিম লীগ নামের আড়ালে কিছু সংখ্যক কুপুত্ররা। আমরা তো আমাদের মায়ের এমন ছিন্নভিন্ন, কাঁটাছেড়া ও খ-িত দেহকে দেখতে চাই নি। মায়ের খ–বিখ- দেহ দেখার জন্যতো জীবনভর আন্দোলন-সংগ্রাম করে নি! সারাটি জীবন প্রায় ফেরারী হয়ে কাটিয়েছি। জুলুম নির্যাতন সহ্য করেছি। দ্বীপান্তরে গিয়েছি। কালাপানির জেলের কঠিন অত্যাচার ভোগ করেছি। বিপ্লবীদের কঠিন জীবনকে ললাট লিখন বলে গ্রহণ করেছি। সারা ভারতবর্ষ ব্যাপী আমাদের অসংখ্য বিপ্লবী সদস্য আত্মহুতি দিয়ে শহীদ হয়েছেন, ক্ষুদিরামের মতো মহান বিপ্লবীরা হাসতে হাসতে ফাঁসির রশিকে গলার মালা জ্ঞান করে জীবন দিয়েছেন, আজকের এ ছিন্নভিন্ন মাতৃভূমির জন্যতো নয় লীলা। আমরা তো আমাদের অখ- ভারত মাতাকে শত্রুমুক্ত করতে চেয়েছিলাম। সা¤্রাজ্যবাদ ব্রিটিশের হাত হতে মুক্ত করতে চেয়েছিলাম আমাদের প্রিয় ভারত মাতাকে। আমরা তা পারি নি। আমাদের বিপ্লব প্রকৃত অর্থে সফল হয় নি। আমাদের বিপ্লব অসমাপ্ত রয়ে গেছে। বিপ্লবীরা কখনও পরাজয় মেনে নেয় না। তারা ধ্বংস হয়ে যায় তবু পরাভব মানতে জানে না। তুমি নিজেও তো আমাদের বিপ্লবীদের কঠিন-কঠোর জীবনের সহযোদ্ধাই ছিলে।
-তা ছিলাম। তোমাদের বিপ্লবকে সমর্থন করি বলেই তোমাকে ভালোবাসেছিলাম।
-আর এ ভালোবাসা অন্য আট দশটা নারীর ভালোবাসার মতো নয়। তোমার এ ভালোবাসা যে শুধু আমাকে নয়, প্রক্ষান্তরে আমাদের বিপ্লকেই ভালোবাসা। দেশ মাতাকেই ভালোবাসা। যে ভালোবাসার জন্য যুগ-যুগান্তর অতিক্রম করেছো। শুধু আমাকে পাওয়ার জন্য নয় নিশ্চয়। আমাকে নিজের করে পাওয়ার সামন্যতম সম্ভাবনাও ছিল না তোমার? তুমি ভালোবেসেছো আমাদের বিপ্লবকে, প্রিয় দেশ মাতাকে যা তুমি পাও নি। ব্রিটিশ রাজ আমার তোমার প্রিয় জন্মভূমিকে, প্রিয় ভারত মাতাকে খ–বিখ- করে দিয়ে গেছে। রোপন করে দিয়ে গেয়েছে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ। যে বিষবৃক্ষ তার বিষাক্ত রস উগ্রে দিয়ে অন্তকাল ধরে এ ভারত মাতার বুককে জ¦ালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়হার করতে থাকবে। রক্তের বিষাক্ত সাগরে খাবুডুবু খেতে থাকবে মানুষ নয় হিন্দু মুসলমান পরিচয়ে। হিন্দু মুসলমান নামের এ দ্বিজাতি তত্ত্ব ব্রিটিশ শাসকদের নীল নকশার উদ্ভাবন। আর মুহাম্মদ আলী জিন্নাদের মতো ক্ষমতা লোভী, নামলোভী, খোলসধারী নেতাদের লোভের ফসল। এরা ধার্মিক না লীলা! ধর্মের খোলসে এরা বকধার্মিক। এই একটি লোকের কথাই ধর। দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা যিনি। তিনি কী ধার্মিক! ইসলামের অন্যতম জীবন বিধান হলো নামাজ পড়তে হবে। মি. জিন্না কী তার সারা জীবনে ভুল করেও একবারের জন্য পশ্চিম দিকে মাথা ঠেকিয়েছে? জীবনভর যিনি পানির মতো মদ্য পান করছে, শুকুরের মাংস যার প্রিয় খাদ্য। আবার মুহূর্তের জন্যও মাথা থেকে টুপিটি খুলে নি। সেই জঘন্য মানুষটি ইসলামের ধোঁয়া তুলে, লড়কে ল্যাঙ্গে পাকিস্তান, পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলে ছুড়ি সপ্তাহ-রায়টের সৃষ্টি করেছে। হাজার হাজার মানুষকে হিন্দু মুসলমানের মোড়কে আবদ্ধ করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। আরেকদল হুক্কা হুয়া আওয়াজ তুলেছে, হিন্দ মাতাকি জয়।
তা-ও মানুষ নয়, বাঙালি নয়, কেবল হিন্দুর মোড়কে আবদ্ধ করে। মহাত্মা গান্ধির মতো মহান নেতাও লুফে নিল সাম্প্রদায়িক ছুড়িটিকেই। সেই ছুড়ি দিয়ে তারা কেঁটেচিড়ে ফালিফালি করল ভারত মাতার পবিত্র দেহকে। আর এ খ–বিখ- দেহের স্ব স্ব খ-িত অংশের জাতির পিতা হলো তারা! আমরা বিপ্লবীরা ভারত মাতার এ বিভাজন কখনও মেনে নিতে পারব না। অখ- ভারত মাতার স্বাধীনতার যে চিন্তা ও দর্শন আমরা লালন ও ধারণ করেছিলাম, সে দর্শন আমরা এ অখ- ভারতবাসির মনে ও মানসে প্রবাহিত করে দিয়ে যাব। অনন্তকাল ধরে আমাদের এ দর্শনের প্রয়োজন অনুভব করবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। অতএব আমাকে যদি অর্থাৎ ভারত মাতাকে যদি তুমি সত্যিকার অর্থে ভালোবেসেই থাক, তাহলে চলো আমাদের অসমাপ্ত বিপ্লবকে সফল করার জন্য কাজ করবে। আমাদের দর্শনকে চিরস্থায়ী করার জন্য আমৃত্যু নিজেকে বিলিয়ে দেবে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমার ভারত মাতার খ-িত অংশ আমার জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐ কালিকচ্ছ গ্রামে বসবাস করতে যাব না। এখানে বসবাস করে মায়ের অপমানকে নিরীহ প্রাণির মতো নিরবে সহ্য করা আমার পক্ষে কঠিন হবে। খ-িত এ জন্মভূমি যে ব্রিটিশরাজ কর্তৃক প্রদত্ত কালাপানির কারাগার থেকেও আমার কাছে কষ্টদায়ক স্থান লীলা।
বিপ্লবী বীর উল্লাসকর দত্তের এমন কঠিন-কঠোর মানোভাবের কথা শুনে শ্রদ্ধা-ভক্তি ও ভালোবাসায় ভরে উঠে-নীলা পালের অন্তর। চিরকাল তিনি যে জন্য উল্লাসকরকে ভালোবেসেছেন। ভালোবেসে যাকে নিয়ে ঘর বাঁধা তো দূরের কথা, জীবনে তাকে কাছে পাওয়ার সামান্য সম্ভাবনাও ছিল না। যদিও পড়াশোনার জন্য একদিন চলে গিয়েছিলেন ল-নে, পিএইচডি করে ফিরে এসে সময়ের প্রেক্ষিতে তাকে ঘর বাঁধতে হয়েছিল নিপেন বসুর সাথে। কিন্তু তিনি তো বিপ্লবী বিপিন পালের কন্যা। তার শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত ছিল বিপ্লবের রক্ত¯্রােত। সেই বিপ্লবী কন্যা নীলা পাল উল্লাসকরের কঠিন-কঠোর মনোভাবের প্রতি শ্রদ্ধাবনত সমর্থন জানালেন। সিদ্ধান্ত নিলেন আর কালিকচ্ছে ফিরে যাওয়া নয়। তারা দেশান্তরী হয়ে গেছেন সাম্প্রদায়িক ছুড়ির আঘাতে। সুতরাং চলে যাবেন অসমের শীলচরে। সেখান থেকে তাদের আদর্শের বাণী, বিপ্লবের মর্মগাঁথা, অসমাপ্ত বিপ্লবের প্রয়োজনের কথা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত করার জন্য জীবনভর কাজ করে যাবেন। এমন সব কঠিন ও কঠোর সিদ্ধান্তের পরিকল্পনা যখন করছিলেন দত্ত দম্পত্তি তখন তাদের উভয়ের জীবনে চলছিল অপরাহ্নবেলা। বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের বয়স তখন তেষট্টি বছর আর তার স্ত্রী নীলা পালের বয়স ঊনষাট বছর। এবং নীলা পাল তখন পক্ষাঘাতগ্রস্থ রোগী। কিন্তু তখনও উভয়ের শোণিতে প্রবাহিত বিপ্লবের টগবগে চেতনা। যে চেতনা তাদের হারতে দেয় না। যে চেতনাই একদিন তাদের বেঁধেছিল ভালোবাসার ডোরে। আবার ছুড়েও ফেলে দিয়েছিল নক্ষত্রসম দূরে। পুনরায় সেই চেতনার জুড়েই শেষ জীবনে এসে বন্ধনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছিলেন সংসার নামের একই ছাদের নিচে। সে এক কঠিন কঠোর জীবনের প্রেক্ষাপট-ষোলশ বার সালে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর যখন ইস্ট ই-িয়া কোম্পানিকে পশ্চিম উপকূলের সুরাটে কুঠি স্থাপন করতে দিয়েছিলেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই কল্পনাও করতে পারেন নি যে, তাঁর ঔদার্যের সুযোগ নিয়ে বেনিয়া, সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজরা এসেছে ভারতীয় উপমহাদেশ লুট করতে, এসেছে রক্তচোষার মতো দেহের প্রতিটি রক্তবিন্দু শুষে নিয়ে এ সমৃদ্ধ অঞ্চলকে ধ্বংস করতে। সতেরশ সাতান্ন সালে পলাশীর যুদ্ধে মীরজাফরদের বিশ্বাসঘাতকতায় ইংরেজ শক্তি জয়ী হলে এক সুদীর্ঘ দুর্ভাগ্যের সূচনা হয় ভারতবাসির।

ঊনিশ সাতচল্লিশ সালে ইংরেজরা চলে গেলেও তছনছ করে দিয়ে যায় উপমহাদেশের মানচিত্র, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, সভ্যতা, শিক্ষা, কৃষি সবকিছু। এ দীর্ঘ পরাধীনতায় ভারতবর্ষের অনেক সূর্যসন্তান সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে হারানো স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করার গৌরবময় পথ বেছে নিয়েছিলেন। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, সূর্যসেন, হাজী শরিয়তউল্লাহ, তিতুমীর-বীর সন্তানদের তালিকা কম লম্বা নয়। এ স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় রচয়িতাদের এমনই একজন বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত। আট দশকের জীবনে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সময়গুলো ‘ব্রিটিশ হটাও’ সংগ্রামে ব্যয় করে ভয়াবহ অত্যাচার, নির্যাতন ভোগ করে তিনি সৃষ্টি করেছেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের গৌরবময় নজির।
উল্লাসকর দত্ত ঊনিশ তিন সালে এন্ট্রান্স পাশ করার পর ভর্তি হয়েছিলেন কোলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের রসায়ন বিভাগে। বিত্তশালী, শিক্ষিত, অভিজাত পরিবারের সন্তান হলেও প্রেসিডেন্সি কলেজের বনেদী আলো-বাতাসে গা ভাসিয়ে দেন নি তিনি। নিজ দেশে ব্রিটিশ শাসন মেনে নিতে পারতেন না। কলেজের এক শিক্ষক প্র্রফেসর রাসেল বাঙালি জাতি সম্পর্কে অপমানসূচক কথাবার্তা বলতেন। একদিন সহ্য করতে না পেরে ওই প্রফেসরের গায়ে হাত তুলেন উল্লাসকর দত্ত। ফলশ্রুতিতে তাঁকে কলেজ থেকে বহিস্কার করা হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার ইতি ঘটলে তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে পূর্ণ মনোনিবেশ করেন। এ প্রতিবাদী পুরুষ তৎকালীন সশস্ত্র বিপ্লবী গোষ্ঠীর হয়ে বোমা বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিস্ফোরণলগ্নে বাংলা হয়ে উঠে সশস্ত্র ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সুতিকাগার। বিপ্ল¬¬বী উল্ল¬¬াসকর দত্তের জন্মগ্রামও হয়ে উঠে ভারত প্রসিদ্ধ। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। যে গ্রাম নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আলোচনা হতো।
ঊনিশ পাঁচ সালে লর্ড কার্জন কর্তৃক বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার পর অবিভক্ত বাংলাসহ সমগ্র ভারতব্যাপী স্বদেশী এবং বিপ্লবী আন্দোলন শুরু হয়। সে সময় সমগ্র অবিভক্ত বাংলায় অনুশীলন ও যুগান্তর নামে দুটি বিপ্লবী গুপ্ত সংগঠনের জন্ম হয়। সাবেক ত্রিপুরা জেলায়ও এ দু’টি সংগঠনের শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। বিপ্লবী উল্ল¬¬াস কর দত্ত যোগ দেন অনুশীলন গ্রুপে।
বিপিন চন্দ্র পালের অনুপ্রেরণাতেই উল্লাসকর দত্ত প্রথম বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। সেই সময় থেকেই তিনি ধুতি ও পাঞ্জাবি পরা শুরু করেন। পরে তিনি যুগান্তর দলে যোগ দেন। তিনি বিস্ফোরক নির্মাণে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তার ফর্মুলায় তৈরী বোমা পরিক্ষা করার জন্যে একদল বিপ্লবী বেছে নেন দেওঘরের নিকট নির্জন দীঘারিয়া পাহাড়। ঊনিশ আট সালের মে মাসের সেই পরিক্ষার দিন বোমা ছোড়ার সময় আহত হয়ে মারা যান বিপ্লবী প্রফুল্ল চক্রবর্তী এবং উল্লাসকর দত্ত মারাত্মক জখম হন। গোপনে কলকাতায় তার চিকিৎসা করেন ডাক্তার ও বিজ্ঞানী ইন্দুমাধব মল্লিক। তখন বিপিন চন্দ্র পালের কন্যা লীলা পাল উল্লাসকরের শারীরিক শ্মশ্রুষা করতেন। বিপ্লবী জীবনের বাইরে উল্লাসকর দত্তের আর লীলা পালের মধ্যে গড়ে উঠে চমকপ্রদ এক প্রেমের সম্পর্ক। স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগদানে যেহেতু উল্লাসকর দত্তের মূল প্রেরণা ছিল বিপিন চন্দ্র পাল সেহেতু তার কলকাতার বাসায় উল্লাসকরের যাতায়াত ছিল। তখনই তার ছোট মেয়ে লীলা পালের প্রেমে পড়েন তিনি। দু’জনেই প্রতিজ্ঞা করেন, একদিন ঘর বাঁধবেন।
ঊনিশ সাত সালে বারিন ঘোষ তার সহযোগিকে হেমচন্দ্র কানুনগো নাম দিয়ে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে প্রেরণ করেন। সেখানে নির্বাসিত রাশিয়ান বিপ্লবী নিকোলাস সাফরান্সকির কাছে বোমা বানানোর কলাকৌশল শেখার জন্য। ঊনিশ আট সালের এপ্রিল অনুশীলন সমিতির তরুণ বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকীকে মোজাফফরপুরে পাঠানো হয় চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট ডি. এইচ কিংফোর্ডকে হত্যার মিশনে। ভুলক্রমে মারা যায় দুই ইংরেজ নারী। এই হামলায় ব্যবহৃত বোমা বানানোর সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন উল্লাসকর দত্ত। ঊনিশ আট সালের দুই মে উল্লাসসকর দত্ত গ্রেফতার হন। উনিশ নয় সালে তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যার রায় দেয় আদালত। ফাঁসির আদেশ শোনার পর উল্লাসকর দত্ত আদালতে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছিলেন-‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে/ সার্থক জনম মাগো তোমায় ভালোবেসে’। আদালতে ফাঁসির রায় শোনার পর উল্লাসকর দত্ত যেমন উচ্চ স্বরে রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছিলেন। তেমনি বিচার চলাকালীন সময়ে তিনি নির্বিকার ছিলেন। ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করতে অস্বীকৃতি জানান উল্লাসকর দত্ত। কারণ তিনি ব্রিটিশের যে আদালত মানেন না, সে আদালতে আপিল করতে সম্মত নন। অবশেষে তার প্রিয় মামা, যাকে তিনি সবচে বেশি ভালোবাসতেন, সেই মহেন্দ্র নন্দীর অনুরোধে আপিলের কাগজে সই করেন। আপিল করলে আদালত ফাঁসির রায়ের পরিবর্তে তাকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়। তবে কারাবাসে উল্লাসকর দত্তকে যে পরিমাণ অত্যাচার ভোগ করতে হয়েছে তাতে সবসময় মনে হয়েছে ফাঁসির রায়ই শ্রেয়তর ছিল। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যারাই সশস্ত্র আন্দোলন করেছেন, শাসকশ্রেণি তাদের চিরতরে মুছে ফেলতে চেয়েছে। সশস্ত্র বিপ্লবীদের ইংরেজ শোষকরা সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে হয় হত্যা করত অথবা ভয়ঙ্কর কারাবাস দিয়ে জীবনের তরে শেষ করে দিতে চাইত। ইংরেজদের এ ভয়াল প্রয়াসের অংশ হিসেবে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থলে অবস্থিত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে তৈরি করে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে লোমহর্ষক কারাগারগুলোর অন্যতম সেলুলার জেল। উল্লাসকর দত্তকে আরও অনেক বন্দীর সঙ্গে পাঠানো হয় সেই সেলুলার জেলে। আঠারশ সাতান্ন সালে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের পরপরই এরা এ সুদূর দ্বীপপুঞ্জকে কারাগার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। ভীতিকর পরিবেশ, রহস্য, নানামুখী নির্যাতনের ভীতিপ্রদ কাহিনী-গল্পের হাত ধরে সেই সেলুলার জেলের নামকরণ হয় ‘কালাপানি জেল’। সেলুলার বলা হয় কারণ সেখানে বন্দীদের পৃথক পৃথক সেল বা কক্ষে বন্দী করে রাখা হতো। শতভাগ নিঃসঙ্গতায় অসহ্য শারীরিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে দিন কাটত বন্দীদের। মুক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত অন্যান্য বন্দীদের মতো ভয়ানক কষ্ট সহ্য করেছেন বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত। অন্যান্য অঞ্চল, যেমন-করাচী কিংবা বার্মার কয়েদীরাও আসত সেই জেলে। কিন্তু বাঙালি বিপ্লবীদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বর্বরতা দেখাত কর্তৃপক্ষ। নারকেল, তিল বা সরিষার দানা থেকে তেল বের করার জন্য আধুনিককালে ইঞ্জিনচালিত যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। ইঞ্জিনচালিত যন্ত্র আসার আগে গরু বা মহিষের সাহায্যে তেলের মিল চালানো হত। আন্দামানে এরকম তেলের মিল ছিল; সে তেলের মিলে ক্রাশিং চাকা ঘোরাতে গরু বা মহিষ কিংবা যন্ত্রের বদলে বন্দীদের ব্যবহার করা হত। একটা মিল চালাতে তিনজন বন্দীকে ব্যবহার করা হত। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলত এ তেল বের করার কাজ। এ অমানুষিক কাজে কোনো বন্দী সামান্যতম ক্লান্তি প্রদর্শন করলে উপস্থিত জমাদার মোটা লাঠি দিয়ে পেটানো শুরু করত। লাঠির আঘাত পর্যাপ্ত মনে না হলে আরও কঠোর ব্যবস্থাও ছিল। মিলের ঘূর্ণায়মান চাকা সদৃশ অংশের হ্যা-েলের সঙ্গে বন্দীকে বেঁধে বাকিদের বলা হত পূর্ণ গতিতে ঘোরানোর জন্য। কল্পনার আখিতে ধাঁধাঁ লেগে যায়। মেঝের সঙ্গে মাথা ক্রমাগত বাড়ি খেত, পাশাপাশি পুরো শরীরে পড়ত প্রচ- চাপ। রাতভর ওই খুপড়ি সেলে বন্দী থাকা, দিনের বেলায় উপরে বর্ণিত নারকীয় অত্যাচার-এসবের ধকল সইতে না পেরে বিপ্লবী উল্লসকর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললে ঊনিশ বার সালের দশ জুন লোহার শিকলে হাত-পা বেঁধে তাঁকে তাঁর সেলে এক সপ্তাহ ফেলে রাখা হয়। তাঁর বেদনা-উৎসারিত চিৎকারে সেলুলার জেলের পরিবেশ ভারী হয়ে থাকত।
উল্লাসকর দত্ত ঊনিশ বিশ সালে আন্দামান থেকে ছাড়া পেয়ে কোলকাতায় চলে আসেন। ফিরে এসে দেখেন তাঁর প্রেয়সী লীলা ল-নে উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফিরে নৃপেন বসু নামে একজন সহকর্মীকে বিয়ে করে সরকারি চাকরি করছেন। জেল থেকে বের হয়ে উল্লাসকর এই সংবাদ পেয়ে বোম্বে গিয়ে লীলাকে তীব্র ভৎর্সনা করেন এবং লীলার সামনে আগুন দিয়ে তার সব চিঠি পুড়িয়ে ধুতির খুঁটে ছাই বেঁধে আবার ফিরলেন জন্মভূমি কালীকচ্ছে।
উল্লাসকরকে পরে ঊনিশ একত্রিশ সালে আবারও গ্রেফতার করা হয় এবং আঠার মাসের কারাদ- দেওয়া হয়। এই দ- শেষে ছাড়া পাওয়াসহ মোট বার বছর পর জানতে পারলেন লীলা পালের স্বামী আকস্মিক মৃত্যুবরণ করলে লীলা বিধবা হয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, পক্ষাঘাতে লীলার অর্ধাঙ্গ অবশ ও কয়েকটি আঙুল চিরতরে বেঁকে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধান চন্দ্র রায় তার চিকিৎসাভার গ্রহণ করেন। এই সংবাদ পেয়ে উল্লাসকর দত্ত লীলাকে নিয়ে আসেন তার ছোট কুঠরিতে। বন্ধুদের সহযোগিতায় ব্রাহ্মমতে ঊনিশ আটচল্লিশ সালে তাদের বিয়ে হয়। তখন উল্লাসকরের তেষট্টি বছর আর লীলার বয়স ঊনষাট বছর। যার মনে অমন ভালোবাসা বেঁধেছিল কৈশোরে, তার পরিপূর্ণতা দেখা গেল ভারসাম্যহীন উল্লাসকরের হৃদয়ে। কৈশোরে যে প্রেম ছিল প্রতিদিনের চাঁদের আলো, বার্ধক্যে সেই প্রেম পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় পূর্ণ বিকশিত হলো। এই দম্পতি টালিগঞ্জের ট্রাম ডিপোর কাছে ছোট একটি ঘরে থাকতেন। দারিদ্র্যের কারণে খুবই মানবেতরভাবে তাদের জীবন কাটছিল। লীলার প্রাপ্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দেওয়া ভাতাই ছিল তাদের চলার অবলম্বন। বাসনা-কামনা-মোহ-রূপ কিছু নেই.. সেদিন হয়েছে দুটি আত্মার মিলন। উল্লাসকর পাগলের মতো সেবা করেছেন অসুস্থ পঙ্গু স্ত্রী’র।
ঊনিশ একান্ন সালের কোনো একসময়ে সমব্যথী দু-একজন বন্ধুর সহযোগিতায় অসুস্থ উল্লাসকর নিজেই পঙ্গু স্ত্রীকে পাঁজকোলা করে স্টিমারযোগে প্রিয় মহানগর কলকাতা ত্যাগ করে অসমের শিলচরের উদ্দেশে পাড়ি জমান। চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করলেও মহাবিপ্লবী উল্লাসকর ভারত সরকার স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদানের জন্য ভাতা মঞ্জুর করলে, তিনি তা গ্রহণে অস্বীকার করেন। শেষ জীবনের চৌদ্দ বছর ওই শহরেই কাটান। তখন তিনি ব্রিটিশের নির্যাতনে মানসিক ভারসাম্য হারানো এক উদাসী বৃদ্ধ, সঙ্গে তাঁর পঙ্গু স্ত্রী। শিলচরের মানুষই তখন তাদের থাকা-খাওয়া, চিকিৎসার যাবতীয় দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আর তাঁর বিপ্লবী বন্ধুরাই নিয়মিত অর্থ সাহায্য করে গেছেন।
ঊনিশ বাষট্টি সালে লীলা পালের মৃত্যু হয়। প্রেমিকা স্ত্রীর মৃত্যুর পরেও উল্লাসকর বিশ্বাস করেন নি যে, তাঁর স্ত্রী আর নেই..। ঘরের দরজা কখনো তিনি বন্ধ রাখতেন না, খোলা রাখতেন। বলতেন, দরজা বন্ধ দেখলে যদি তাঁর স্ত্রী ফিরে যান। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের খাবার থেকে এক ভাগ স্ত্রীর নামে রেখে দিতেন, যদি স্ত্রী ফিরে এসে খেতে চায়। কোনো সিনেমার চিত্রনাট্য নয়, নয় কোনো লেখকের গল্প, এটা এক বাস্তব ঘটনা। ঘটনার নায়ক উল্লাসকর দত্ত আর নায়িকা লীলা পাল।

লেখক : আমির হোসেন