তিতাস পাড়ের শিল্প-সাহিত্যের প্রাণ পুরুষ ছিলেন কবি মতিউল ইসলাম

সাহিত্য, 30 October 2023, 80 বার পড়া হয়েছে,
আমির হোসেন : কবি মতিউল ইসলাম ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে ৫ নভেম্বর তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার নাসিরনগর এর গুনিয়াউক গ্রামের ’শাহ্’ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শাহ্ ছালামত আলী, মাতা জিন্নাতুন নেছা। কবি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ’দুলালী’তে নিজের পারিবারিক নাম ’শাহ্ মতিউল ইসলাম’ ব্যবহার করেন। এরপর থেকে তিনি তাঁর পারিবারিক পদবি ’শাহ’ আর কখনো তাঁর সাহিত্য জীবনে ব্যবহার করেননি।
কবির শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্রামের মক্তবে। অত:পর তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৎকালীন জজ স্কুল (বর্তমানে নিয়াজ মুহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়) থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ১৯৩৫ সালে তিনি কলকাতা যান এবং সেখান থেকে আই এ পাশ করার পর কর্মজীবন শুরু করেন। কর্মজীবনে তিনি বিচিত্র অভিজ্ঞতা লাভ করেন। ঢাকা এবং কলকাতার বহু প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন ভিন্ন পদে চাকরি করেছেন। এ ছাড়াও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৪ সালে মতিউল ইসলাম লাহোরে ওয়াল্টন ট্রেনিং সেন্টার বিমান বাহিনীর টেলিপ্রিন্টার অপারেটর হিসেবে যোগ দেন। এখান থেকে বদলি হয়ে যান মাদ্রাজের হাকিম গেটে। তারপর যান রেঙ্গুনে, কলকাতার মিনিস্ট্রি অব কমার্সে ইমপোর্ট বিভাগে সুপারভাইজার নিযুক্ত হন। ভারত বিভক্তির সময় তিনি পাকিস্তান সরকারের কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে চাকরিতে যোগ দিয়ে চট্টগ্রাম, করাচি ইত্যাদি নানা জায়গায় কর্মজীবন অতিবাহিত করেন। ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রামে আমদানি রফতানির নিয়ন্ত্রক হিসেবে কর্মরত থাকার সময় সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে বসবাস করেছেন। এ সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। তাঁকে ঘিরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তখন একটি সাহিত্যের আড্ডাও গড়ে উঠেছিল।
কবি মতিউল ইসলামের কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা সাতটি। প্রকাশের ক্রম অনুসারে সেগুলো হচ্ছে : দুলালী (১৯৩৬), ফরিয়াদ (১৯৪৭), মাটির কন্যা (১৯৪৮), কায়েদ আজম, তোমার জন্য (১৯৫০), প্রিয়া ও পৃথিবী (১৯৫৫), সপ্তকন্যা (১৯৫৭) ও পুষ্পবীথি (১৯৬২)।
১৯৫৪ সালে ’দিবা ও রাত্রি’ নামে তাঁর একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া তিনি কয়েকটি গ্রন্থ-সমালোচনা ও ব্যক্তিগত নিবন্ধ রচনা করেছেন। এখন আর সেগুলোর সন্ধান পাওয়া সম্ভব নয়। ১৯৭০-এ শাহ আহমদ সংকলিত ’মতিউল ইসলামের গান’ প্রকাশিত হয়। কবির অগ্রন্থিত কবিতার সংখ্যাও কম নয়। তিরিশের দশকের শেষাংশ ও ’মোহাম্মদী’ পর্ব থেকে মৃত্যুপূর্ব ‘চৌপদী’ রচনার কাল পর্যন্ত অগ্রন্থিত বহু কবিতা নানা পত্র-পত্রিকায় ছড়িয়ে রয়েছে। জীবনের শেষাংশে মৃত্যুর প্রায় এক দশক পূর্ব থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থানকালে তিনি বহু চৌপদী লিখেছেন। যেগুলো নানা পত্র-পত্রিকায় ছড়িয়ে থাকলেও গ্রন্থাকারে একত্রিত হয় নি। ১৯৫৭ সালে তিনি কিশোর সাহিত্য সংকলন ‘প্রান্তিক’ ও ১৯৬৭ সালে চট্রগ্রাম থেকে ‘আগ্রাবাদ ক্লাব বার্ষিকী’ সম্পাদনা করেন। কবিতার জন্য মতিউল ইসলাম ১৯৭৬ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। এটি ১৯৭৭ এর ২০ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত হয়। এ ছাড়াও সাহিত্য জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি বিভিন্নভাবে সম্মানিত হয়েছেন।
কবি মতিউল ইসলাম ১৯৮৪-র ২৯ অক্টোবর সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পশ্চিম পাইকপাড়ায় তাঁর নিজের বাসভবন ‘কবিতা ভবনে’ ৭০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। কবির মৃত্যুর পর নভেম্বর (১৯৮৪) প্রথম সপ্তাহে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চারটি শোকসভা হয়। শোক সভাগুলোর আয়োজক ছিল সাহিত্য একাডেমি, ঋত্বিক, পুরবী ও সুরভি, কচিকাচার মেলা, জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফটোগ্রাফিক সোসাইটি। জেলা শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত শোকসভায় লেখক, প্রাবন্ধিক শান্তনু কায়সার কবির রচনার একটি সংকলন অথবা তাঁর উপর একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন। কবির জ্যেষ্ঠ পুত্র শাহ্ জহিরুল ইসলাম বলেছিলেন, কবির অন্তিম ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কেউ এ কাজটি করতে এগিয়ে এলে কবি পরিবার তাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জেলা শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশের ঘোষণা দেয়া হয়। এটি সম্পাদনা করেছেন শান্তনু কায়সার। কবির প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মারক গ্রন্থটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে কবির স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য জেলা শিল্পকলা একাডেমি তাঁর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সহ-সভাপতির নামে তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী থেকে একটি সাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তণের ঘোষণা দেয়। শিল্পকলা একাডেমির তৎকালীন সভাপতি ও জেলা প্রসাশক, সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সংশিষ্ট সকলেই এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন। এ ব্যাপারে একটি পুরস্কার প্রদান কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। কবি মতিউল ইসলামের নামে সাহিত্য-পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা দিয়েও জেলা শিল্পকলা একাডেমির তৎকালীন সদস্যদের দয়িত্বহীনতার কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
কবির প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে (১৯৮৫) সাহিত্য একাডেমি আয়োজিত স্মরণ সভায় ‘মতিউল ইসলাম স্মারক’ বক্তৃতা’ আয়োজনের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এ সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৯৮৬ সাল থেকে সাহিত্য একাডেমির উদ্যোগে প্রতিবছর নিয়মিতভাবে এই স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করা হচ্ছে। স্মারক বক্তৃতাটি প্রদত্ত হয় অক্টোবরের শেষ অথবা নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে, কবির মৃত্যু ও জন্ম বার্ষিকীর স্মারক হিসেবে। (তবে বিশেষ কারণে কখনো এর তারিখও পরিবর্তন করতে হয়।) ‘মতিউল ইসলাম স্মারক বক্তৃতার’ মধ্য দিয়ে প্রয়াত কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনারও আয়োজন করা হয়। ১৯৮৬ সাল থেকে প্রতিবছর নিয়মিতভাবে প্রদত্ত স্মারক বক্তৃতার বিররণ থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে।
আমির হোসেন, কথাসাহিত্যিক
সম্পাদক-সাহিত্যের ছোট কাগজ ‘স্বদেশ’
চেতনায় স্বদেশ গণগ্রন্থাগার, ২৮১, শিমরাইলকান্দি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।