অপসাংবাদিকতা: সত্যের অপলাপ ও আমাদের করণীয়

মতামত, 12 May 2026, 15 বার পড়া হয়েছে,

সাংবাদিকতাকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো মুক্ত গণমাধ্যম। কিন্তু বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির অবাধ প্রসার এবং তথ্যের অতিপ্রাচুর্যের ভিড়ে প্রকৃত সাংবাদিকতা আর অপসাংবাদিকতার মধ্যকার সীমারেখা দিন দিন অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। সাংবাদিকতা যেখানে সমাজকে আলোকিত করার কথা, সেখানে অপসাংবাদিকতা সমাজকে বিভ্রান্তির অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে।

​সহজ কথায়, সাংবাদিকতা হলো জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ ও সত্যনিষ্ঠ তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সাংবাদিকতা মানে কেবল খবর পরিবেশন নয়, বরং খবরের পেছনের সত্য তুলে ধরা। একজন প্রকৃত সাংবাদিকের প্রধান ধর্ম হলো নিরপেক্ষিত। সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি তিনটি: সত্যতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং নৈতিকতা। যখন এই তিনটি উপাদানের সমন্বয় ঘটে, তখন সেটি দেশ ও জাতির দর্পণ হিসেবে কাজ করে।
​সাংবাদিকতার মহৎ উদ্দেশ্যকে যখন ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল বা কাউকে সামাজিকভাবে হেয় করার কাজে ব্যবহার করা হয়, তাকেই বলা হয় অপসাংবাদিকতা। এটি মূলত সাংবাদিকতার একটি বিকৃত রূপ।
যাচাই-বাছাই ছাড়াই কোনো খবর প্রকাশ করা।অতিরঞ্জিত শিরোনাম বা চটকদার সংবাদ দিয়ে পাঠক টানার চেষ্টা। উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারো সম্মানহানি করার জন্য সংবাদ ছাপানো। খবরের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি বা বিশেষ সুবিধা গ্রহণ। আংশিক সত্য প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো।
​অপসাংবাদিকতা কেবল একজন ব্যক্তির নয়, পুরো পেশার ভাবমূর্তি নষ্ট করে। এটি রোধ করতে হলে সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই। প্রতিটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে শক্তিশালী সম্পাদকীয় বিভাগ থাকা জরুরি। কোনো সংবাদ প্রকাশের আগে তার সূত্র এবং সত্যতা অন্তত দুইবার যাচাই করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সংবাদকর্মীদের নিয়মিত সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা ও আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বিশেষ করে অনলাইন পোর্টালে কাজ করা সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ ওয়ার্কশপ প্রয়োজন। প্রেস কাউন্সিলসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে। অপসাংবাদিকতার প্রমাণ পেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, এই আইন যেন আবার মুক্ত সাংবাদিকতার পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান ডিজিটাল যুগে ‘ফ্যাক্ট চেকিং’ বা তথ্য যাচাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সংবাদ সন্দেহজনক মনে হলে তা যাচাই করার জন্য নিজস্ব টিম বা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। পাঠকদেরও বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করতে হবে। যেকোনো চটকদার শিরোনাম দেখলেই তা বিশ্বাস না করে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো খবর শেয়ার করার আগে তার সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।
​সাংবাদিকতা একটি পবিত্র পেশা। এই পেশার মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্ব যেমন সাংবাদিকদের, তেমনি রাষ্ট্র ও সমাজেরও। অপসাংবাদিকতা রোধে প্রয়োজন নৈতিকতার চর্চা এবং পেশাদারিত্বের প্রতি আপসহীন আনুগত্য। আমরা যদি সত্যকে আড়াল না করি এবং মিথ্যার কাছে মাথা নত না করি, তবেই সাংবাদিকতা তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে।
​মনে রাখতে হবে, কলম যেন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতিয়ার না হয়ে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। সেখানেই সাংবাদিকতার প্রকৃত সার্থকতা।
আদিত্ব্য কামাল, সম্পাদক জনতার খবর