মো. আজহার উদ্দিন,ব্রাহ্মণবাড়িয়া : সন্তান ও পরিবার থাকা সত্ত্বেও জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একাকী ও অসহায় দিন কাটাচ্ছেন ৭০ বছরের বেশি বয়সী এক বৃদ্ধা, স্থানীয়ভাবে যিনি ‘ফুলি’ নামে পরিচিত। অসুস্থতার কারণে নিজের নাম-পরিচয়ও ঠিকমতো বলতে পারছেন না তিনি। বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ওই বৃদ্ধা। তার পাশে দায়িত্ব নেওয়ার মতো পরিবারের কাউকে না পাওয়ায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর তার চিকিৎসা ও দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, আগের তুলনায় বৃদ্ধা ফুলির শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে তাকে দেখাশোনা করার জন্য পরিবারের কেউ না থাকায় চিকিৎসা ও দৈনন্দিন পরিচর্যায় নানা সমস্যা হচ্ছে। বর্তমানে বাতিঘরের তত্ত্বাবধানে তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর আগে শনিবার রাত সোয়া ১০টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের তত্ত্বাবধানে ওই বৃদ্ধাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পর সংগঠনটির পক্ষ থেকে তার প্রয়োজনীয় ওষুধ, খাবার, পানি, চাটাই, বালিশসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবস্থা করা হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার বিকেলে সরাইল সদর ইউনিয়নের বড্ডাপাড়া গরুর বাজারের সামনে অসুস্থ অবস্থায় পড়ে ছিলেন বৃদ্ধা ফুলি। খবর পেয়ে সরাইল সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল জব্বার তাকে উদ্ধার করে সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।
সেখানে দুই দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্সচালক জাকিরুল ইসলাম ও স্বাস্থ্যকর্মী রাসেল চৌধুরী তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এর আগেও বৃদ্ধা ফুলি দীর্ঘদিন অসুস্থ অবস্থায় সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ওই সময় তার ছেলে বাঁশের মই দিয়ে তাকে বহন করে বাড়িতে নিয়ে যান। তবে এবার হাসপাতালে ভর্তি করার পর থেকে তার ছেলে আর তাকে নিতে আসেননি। এমনকি এখন পর্যন্ত তার কোনো খোঁজখবরও পাওয়া যায়নি বলে স্থানীয়রা জানান।
সরাইল সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল জব্বার বলেন, “সরাইল গরুর বাজার এলাকায় এক অসুস্থ বৃদ্ধা পড়ে থাকার খবর পেয়ে আমরা দ্রুত সেখানে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করি। তার বাড়ি সরাইল সদরের উচালিয়াপাড়া গ্রামে এবং তার একটি ছেলে রয়েছে। তবে ছেলেটিকে এখনো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা তার সন্ধান চালাচ্ছি। তাকে পাওয়া গেলে মায়ের বিষয়ে বিস্তারিত জেনে প্রয়োজনীয় আইনি ও সামাজিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বৃদ্ধা ফুলির এমন অসহায়ত্বের খবর পেয়ে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. আজাহার উদ্দিন বলেন, “বৃদ্ধার সন্তান বা পরিবারের কোনো স্বজন দায়িত্ব নিতে এগিয়ে না এলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের উদ্যোগে তার চিকিৎসা চালিয়ে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করা হবে। পরবর্তীতে তার জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থাও করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “রোববার সন্ধ্যায় বৃদ্ধা ফুলির শারীরিক অবস্থা আগের তুলনায় ভালো ছিল। তবে শারীরিক দুর্বলতার কারণে তিনি হাসপাতালের বিছানায় প্রস্রাব-পায়খানা করে ফেলছেন। আগামীকাল তাকে গোসল করিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার ব্যবস্থা করা হবে।”
প্রকৌশলী মো. আজাহার উদ্দিন বলেন, “একজন বৃদ্ধা মা যেন সন্তানের অবহেলায় জীবনের শেষ দিনগুলো একাকিত্ব ও কষ্টে কাটাতে বাধ্য না হন, এটি শুধু তার পরিবারের নয়, আমাদের সবার মানবিক দায়িত্ব। যে মা-বাবা সন্তানকে স্নেহে আগলে বড় করেন, অসুস্থ হলে রাত জেগে সেবা করেন এবং নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে মানুষ করেন, বৃদ্ধ বয়সে সেই মা যখন অসহায় হয়ে হাসপাতালের বিছানায় পড়ে থাকেন, তখন তার পাশে দাঁড়ানো সন্তানের প্রাথমিক দায়িত্ব।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক রতন কুমার ঢালী বলেন, “ভর্তির পর থেকেই বৃদ্ধার চিকিৎসা চলছে। পরিবারের কেউ না আসায় এবং পাশে না থাকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চালানো হচ্ছে। হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা নিয়মিত তার সেবা দিচ্ছেন। এ বিষয়ে হাসপাতালের পক্ষ থেকে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।”
এদিকে বৃদ্ধা ফুলির পরিচয় ও পরিবারের সন্ধান পেতে সংশ্লিষ্ট সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের দ্রুত তার দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে তার স্বজনদের সন্ধান এবং পরিচয় নিশ্চিত করতে সমাজের সচেতন মানুষদেরও এগিয়ে আসার অনুরোধ করা হয়েছে।