‘কল্পকথা-পুনরুত্থানের পর’ -মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ

মতামত, 12 May 2022, 210 বার পড়া হয়েছে,

পুনরুত্থানের পর কোন এক দেশের সব মানুষদের পাপ-পুণ্যের হিসাব করা হচ্ছে। একে একে বিভিন্ন গোষ্ঠীর হিসেবের পর আসলো ব্যবসায়ীদের পালা। তখন কিছু ব্যবসায়ীরা এসে হিসাবের পাল্লায় নিজেদের ভালো কাজের বস্তাগুলো রাখতে লাগলো। যেমন, তারা অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিমার্ণ করেছে, এসব প্রতিষ্ঠানে অনুদান দিয়েছে, অনেক সামাজিক কাজকর্ম করেছে, অনেক অসহায় মানুষদেরকে সহযোগিতা করেছে, এসব ভালো ভালো কাজের বস্তাগুলো তারা দাঁড়িপাল্লায় রাখতে লাগলো। তা দেখে কিছু ভোক্তা এসে তখন দাঁড়িপাল্লার অপর পাশে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন অপকর্মের বস্তা যেমন, ওজনে কম দেওয়া, ভেজাল পণ্য বিক্রি করা, দাম বেশি রাখা, গোপনে পণ্য মজুদ করে জনগণকে জিম্মি করা, ক্রেতাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা, এইসব খারাপ খারাপ কাজের বস্তাগুলো দাঁড়িপাল্লার অপর পাশে রাখতে লাগলো।

দূর থেকে সেই ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের এই মাপজোখ দেখতে ছিল কিছু রাজনীতিবিদ। তারা হিসাব করে দেখলো যে, ব্যবসায়ীদের ভালো কাজের চেয়ে খারাপ কাজের পাল্লাটা কিছুটা ভারী। তখন রাজনীতিবিদরা চিন্তা করতে লাগল ব্যবসায়ীরা হচ্ছে আমাদের সময়-দুঃসময়ের বন্ধু। এই খারাপ সময়ে আমরা যদি তাদের পাশে না থাকি তাহলে তাদের নরকে যাওয়া নিশ্চিত। তাই তখন কিছু রাজনীতিবিদ এসে নিজেদের ভালো কাজের কিছু বস্তা ব্যবসায়ীদের ভালো কাজের বস্তার সাথে মিলিয়ে রাখল।

যথারীতি স্বর্গ-নরকের কর্মকর্তাগণ দাঁড়িপাল্লা ওজন করে দেখলো ব্যবসায়ীদের ভালো কাজের পরিমাণ বেশী। তাই তারা ব্যবসায়ীদেরকে স্বর্গে যাওয়ার সুযোগ করে দিল।

এরপরে রাজনীতিবিদদের হিসাবের পালা। তখন কিছু রাজনীতিবিদগণ নিজেদের ভালো কাজের বস্তাগুলো দাঁড়িপাল্লায় রাখতে লাগলো। তারা দেশের মানুষের জন্য যে সমস্ত ভালো কাজ করেছে যেমন, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসের সুবিধা দিয়েছে, শিল্প কারখানা নির্মাণ করেছে, রাস্তাঘাট নির্মাণ করেছে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়েছে, চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে, এরকম ভালো কাজের বস্তাগুলো দাঁড়িপাল্লায় রাখতে লাগলো। অপরদিকে সে দেশের জনগণ রাজনীতিবিদদের অপর পাল্লায় সময়মত পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস না পাওয়া, ভাঙ্গা রাস্তা-ঘাটের অভিযোগ, নদী-খাল দখলের অভিযোগ, অফিস-আদালতে দুর্নীতির অভিযোগ, বিদেশে অর্থ পাচার, অবৈধভাবে সম্পত্তি অর্জন, অপরে জমি দখল, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এরকম নানা অপকর্মের বস্তাগুলো রাজনীতিবিদদের অপর পাল্লায় রাখতে লাগলো।

কিছুক্ষণ পর স্বর্গ-নরকের কর্মকর্তারা যখন দাঁড়িপাল্লাটি ওজন করলো তখন দেখা গেল রাজনীতিবিদদের ভালো কাজের চাইতে খারাপ কাজের পাল্লাটা বেশি ভারী। এ অবস্থায় রাজনীতিবিদদেরকে তারা নরকে পাঠাতে উদ্যোগী হলো। রাজনীতিবিদরা নিজেদের বিপদ টের পেয়ে এবার ব্যবসায়ীদেরকে ডাক দিল। ব্যাবসায়ীরা তখন স্বর্গে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে। ‘চোরো চোরে মাস্তুত ভাই’- রাজনীতিবিদদের বিপদ দেখে ব্যবসায়ীরাও তাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসলো এবং নিজেদের কিছু ভালো কাজ রাজনীতিবিদদের ভালো কাজের সাথে মিলিয়ে রাখল। তখন দেখা গেল রাজনীতিবিদদের ভালো কাজের পরিমাণ এখনো যথেষ্ট কম। তাই স্বর্গ-নরকের কর্মকর্তারা রাজনীতিবিদদে নরকে পাঠাতে উদ্যোগী হল। অপরদিকে রাজনীতিবিদদেরকে নিজেদের ভালো কাজের অংশ দিয়ে দেওয়ায় ব্যবসায়ীদের ভালো কাজের অংশ কমে গেলো ফলে তাদের কেউ নরকে যেতে বলা হলো।

উভয় দল এবার সহযোগিতা চাইলো আমলাদের। কিন্তু আমলারা ছিলো যথেষ্ট শিক্ষিত এবং বুদ্ধিমান। তারা সাফ জানিয়ে দিলো, পৃথিবীতে তাদের ভালো কাজের কাজের সংখ্যা খুব বেশি নয়, তারপর গোপনে গোপনে আবার নানান অনিয়ম করছে। তারা নিজেদের হিসাব নিয়েই শঙ্কিত। কাজেই ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের সহযোগিতা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের নরকে যাওয়া নিশ্চিত হলো।

এই মাপামাপিতে সময় অনেকটা বেশি লেগে যাওয়ায় স্বর্গ-নরকের কর্মকর্তারা সে দেশের জনগণকে বলল আমাদের অন্যদিকে কাজ আছে, আপনারা আপনাদের রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদেরকে একটা বড় রশিতে বেঁধে নরক নিয়ে দিয়ে আসুন, তারা কিন্তু নিজেরা স্বেচ্ছায় যেতে চাইবে না।বলেই তারা চলে গেল।

দেশের জনগণ পৃথিবীতে সারাজীবন অনেক কষ্ট করেছে, তাই তারা ভাবলো ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের প্রতি প্রতিশোধ নেওয়ার এটাই সুবর্ণ সুযোগ । তারা সকল ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের এক সাথে বাঁধতে চাইলো। কিন্তু এই সময় কিছু জনগণ এই বললে আপত্তি তুলল যে, সকলকে একসঙ্গে বাঁধলে তাদেরকে ধাক্কা দিয়ে নরকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিবিদদের আলাদা আলাদা বাঁধতে হবে। কেউ আবার বলল আমরা কেন ধাক্কা দিতে যাব; যাদের কাজ তারা ধাক্কা দিবে, আমরা দিবো না। কেউ কেউ বলল, ব্যবসায়ী ও জনগণকে একসঙ্গে বাঁধলে তাদের শক্তি বৃদ্ধি পাবে, ফলে তারা আমাদেরকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে পারে। তাদেরকে আলাদা আলাদা বাঁধাই ভালো। কেউ কেউ বলল, আমরা জনগণ সংখ্যায় বেশি আমাদের শক্তি বেশি কাঁজেই তারা আমাদের সাথে পারবে না। আমরা এক সাথেই বাঁধবো। কেউ বলল যদিও তারা নরকে যাবে কিন্তু তারাতো পৃথিবীতে আমাদের জন্য অনেক ভালো কাজও করেছে। আমাদের অনেক উপকার করেছে, কাজেই আমাদের এতোটা নিষ্ঠুর হওয়া ঠিক নয়।আমরা ধাক্কাধাক্কিতে নেই।

এই নিয়ে জনগণের মধ্যে বিরাট মতবিরোধ দেখা দিলো। কেউ একসঙ্গে বাঁধার পক্ষে, কেউ আলাদা আলাদা বাঁধার পক্ষে। কেউ আবার নিরপেক্ষ ভূমিকায়, তারা কোন পক্ষে গেল না। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখতে লাগলো। কেউ আছে সুবিধাবাদী, তারা চিন্তা করতে লাগল এই তর্ক যুদ্ধে যেই দল জিতে যাবে আমরা তাদের সঙ্গে থাকব। এইভাবে দেশের জনগণ নানাভাবে বিভক্ত হয়ে গেল, ফলে ব্যবসায়ী আর রাজনীতিবিদদের নরকে পাঠানো আর সম্ভব হলো না।

দেশের জনগণের বিচার কাজ শেষ হয়েছিলো আরো আগেই তাই তাদের অনেকের স্বর্গ যাওয়ার রায় হয়েছিলে। কিন্তু বেশিরভাগ জনগণ কঠিন শপথ নিলো ব্যাবসায়ী ও রাজনীতিবীদদের নরকে না পাঠিয়ে তারা নিজেরা স্বর্গ যাবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনগণ ঐক্যমত না হওয়ায় তাদের নরকে পাঠানো সম্ভব হলো না। এভাবে সেদেশের জনগণ, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা অনন্তকাল নিজেদের পাপ-পুণ্যের বোঝা নিয়ে স্বর্গ-নরকের মাঝখানে অবস্থান করতে লাগলো।

বিঃদ্রঃ এই লেখাটি কোন দেশের সকল জনগণ, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী বা আমলাদের হেয় করার উদ্দেশ্য নয়। তবে যারা খারাপ তারা নিজেরা অপমানিতবোধ করলে আমার কিছুই করার নেই।

মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া