নিঃসঙ্গ এক কথাসাহিত্যিক জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী -আমির হোসেন

ব্রাহ্মণবাড়িয়া, 30 July 2026, 2 বার পড়া হয়েছে,

বহুমাত্রিক সৃজনশীলতার সোনালি প্রবাহে জোর্তিময় মেঘনা কন্যা তিতাস বিধৌত ব্রাহ্মণবাড়িয়া একটি উর্বর সংস্কৃতিজ উৎকর্ষিত বেলাভূমি। আবহমান কাল থেকেই শিক্ষা ও সংস্কৃতির নিবিড় মেলবন্ধনে মুখরিত এই জনপদ। কালজয়ী ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পুরোধা এই জেলাতে জন্ম নিয়েছেন বিপুল সংখ্যক শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। সুরের ভুবনে এক চিরঞ্জিব সাধক পুরুষ সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সেই কৃর্তিমান পুরুষ বাবু উল্ল¬াসকর দত্ত, অবিভক্ত বাংলার এসেন্বিলিতে বাংলা ভাষার প্রথম দাবি উত্থাপনকারি শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, কংগ্রেস নেতা ব্যরিস্টার এ রসুল, দানবীর মহেশ ভট্টাচাযর্, তিতাস একটি নদীর নাম নামক কালজয়ী উপন্যাসের লেখক অদ্বৈত মল¬বর্মণ, বার ঘর এক উঠোনের লেখক জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীসহ আরও অনেক প্রতিভাবান বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, যাঁরা তাঁদের অকৃত্রিম কৃতিত্ব ও প্রতিভার শাণিত ইন্দ্রজালে উজ্জীবিত করে ললাটে ধারণ করেছেন কিংবদন্তির তিলক। ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে বসিয়েছেন গর্বিত জননীর স্বর্ণ আসনে।
আর পল্লীবালার হাতের কাঁকনের মতো বলয়াকৃতি ¯িœগ্ধ বহতা সলিলকন্যা এ জেলার প্রধান নদী তিতাস। তিতাস এমন এক নদী যা এক অলৌকিক রহস্যময়তায় আকর্ষণ করে নিবিড় অন্তরঙ্গতায়। কবি সানাউল হক আমাদের ভালোবাসার নদীকে বর্ণনা করেছেন এভাবে-শীতল পাটির মতো ঠিক আমাদের প্রিয় নদী রূপালি কেশের গুচ্ছ, সূচীকরণ ঢেউ-ঢেউ যার তনুপুর্ণা-কতো স্নান উম্মীলিত ভাঁজে ভাঁজে তার। ডুব দাও গহীন বুকের স্বাদ পেতে চাও যদি। ঘাটে ঘাটে ডুব-লুকোচুরি, ওঁৎপাতা লুদ্ধ উঁকিঝুকি স্ফুটিত স্তনের মতো আভা এক ফালি বুঝি সুরলোক। ঢল ঢল কী আভা স্ফুটিক মুখে, কী শান্তশ্রী চোখ আকর্ষণে ঝাঁপ দেয় সন্ধাতারা, চাঁদ সোনামুখী কাব্যগন্ধী নামের এই ছোট কাঁকন প্রতিম নদীর প্রেমে কে না পড়েছেন। আল মাহমুদ-তিতাস পাড়ের এই কবি তাঁর ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ গ্রন্থে লিখেছেন-ঘুঘু পাখির চোখের মতো স্বচ্ছ এর পানি। স্রোত আছে কি নেই ঠিকমত ঠাহর করা যায় না। ঢেউয়ের ভেতর হাত নামালে অকস্মাৎ বোঝা যায় অতলে অন্তরালবর্তী স্রোত বয়ে যাচ্ছে। এই নৈশব্দের নদীতে স্নান, পান ও ডুব সাঁতার কেটে বেড়ে উঠছেন কত কবি, সঙ্গীতজ্ঞ ও কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব।
আল মাহমুদ তাঁর ‘তিতাস’ নামের কবিতায় লিখেছেন-এ আমার শৈশবের নদী, এই জলের প্রহার সারাদিন তীর ভাঙে, পাক খায়, ঘোলা স্রোত টানে। যৌবনের প্রতীকের মতো অসংখ্য নৌকার পালে গতির প্রবাহ হানে, মাটির কলসে জলভরে ঘরে ফিরে সলিমের বউ, তার ভিজে দু‘টি পায়। অদূরের বিল থেকে পানকৌড়ি, মাছরাঙ্গা, বক পাখায় জলের ফোঁটা ফেলে দিয়ে উড়ে যায় দূরে, জনপদে কি অধীর আকোলায় মায়াবী এ নদী এনেছে স্রোতের মতো, আমি তার খুঁজিনি কিছুই। আর তিতাসকে পরিচিতির আলোয় এনেছেন অদ্বৈত মল¬বর্মণ। তাঁর লেখায় এই নদীর শীত গ্রীষ্মের বারমাস্যা যে অনুকরণীয় মুগ্ধতায় আঁকা হয়েছে তার তুলনা মেলা ভার। তিতাসের তনুদেহ ঘিরে যে কবিতায় রূপোচ্ছাস অদ্বৈত তাই ছড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর উপন্যাস “তিতাস একটি নদীর নাম” এর সর্বাঙ্গে। এই তিতাস আর ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিনে সুতীর মালাগাথা এক অনন্য সেতু বন্ধন। একে অন্যের সম্পূরক। বেদব্যাস প্রণীত পুরাণে বর্ণিত কালীদহ সায়র, সমতট রাজ্য, মধ্য যুগের সরাইল পরগণা, বৃটিশ শাসনাধীন সময়ের ত্রিপুরা জেলা এবং সাতচল্লি¬শ পরবর্তী কুমিল¬া জেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমা থেকে আজকের তিতাস বিধৌত আধুনিক ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা। তিতাসের স্রোত ধারার মতোই বহমান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গুণীমানুষের ইতিহাস।
রতœ প্রসবিনী এ জেলা এখানকার মাটি ও মানুষের সুনাম ও সুখ্যাতির জন্য উপমহাদেশের ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। ধর্ম-দর্শন, অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ তথা মানব কল্যাণের সকল দিগন্ত ও প্রান্তরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অবদান উল্লেখযোগ্য। মূলত: অফুরন্ত সম্পদ, ইতিহাস-ঐতিহ্য, মেধা-মনন ও প্রতিভার দিক থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া উপমহাদেশে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। গৌরবময় অতীত ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের পতাকা যাঁরা বয়ে চলেছেন তাঁরা এ জেলার স্বর্ণ-সন্তান ও গর্বের ধন। এ জেলার নৈসর্গিক, প্রতœতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক, সামাজিক ধ্যান-ধারণা এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য, সঙ্গীত, মুক্তিযুদ্ধ ও কিংবদন্তিতুল্য বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ ও তাঁদের সাধনার কথা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে অতি যতœ সহকারে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাহিত্যের একটি গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। এ জেলার সাহিত্য চর্চা নেহায়ত এক ‘শ-দু‘শ বছরের নয়। প্রাচীন এবং মধ্য যুগেও এ অঞ্চল সাহিত্যে সমৃদ্ধ ছিল। যা সংরক্ষণের অভাবে আবিস্কৃত হয়নি। আজকের ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে একসময় বলা হতো উপমহাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির রাজধানী। তবে আধুনিককালে এসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাহিত্যে পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে। বর্তমানেও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস জুড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের অবদান ও সুদৃঢ় অবস্থান অনস্বীকার্য। যুগে যুগে এ অঞ্চলে জন্মেছেন বহু সৃষ্টিশীল মানুষ যাঁদের আলোয় পুরো বাংলা সাহিত্যাকাশ উদ্ভাসিত।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার অন্তর্গত পাখি ডাকা, ছায়া ঢাকা, সবুজ শ্যামল একটি গ্রাম কালিকচ্ছ। রতœ-প্রসবিনী এ গ্রামটি। বিগত প্রায় তিন শতাব্দী সময়ব্যাপী একটি গ্রামে এতগুলো গুণীলোকের জন্মগ্রহণ বিশ্বের বিস্ময়। কালিকচ্ছের মত গৌরবময় আরেকটি গ্রাম উপমহাদেশে আমরা আজও খুঁজে পাইনি। এ গ্রামে খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে দেওয়ান রামদুলাল নন্দীর মত ভারতখ্যাত গীতিকার যেমন জন্মগ্রহণ করেছেন তেমনি তার পুত্র আনন্দ নন্দী সর্বধর্ম সমন্বয় নামক একটি আধুনিক ধর্মীয় মতবাদের স্রষ্টা। তার পুত্র মহেন্দ্র নন্দী স্বদেশী আন্দোলনের একজন নেতাই ছিলেন না উপমহাদেশে তিনিই প্রথম খদ্দরের কাপড় তৈরি করে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। তিনি ছিলেন একাধারে স্বদেশী বিপ্লবী, চিকিৎসক এবং প্রকৌশলী। তাঁর পুত্র বিপ্লবী অশোক নন্দী ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে বহুলালোচিত আলীপুর বোমা মামলা‘য় অভিযুক্ত হয়ে বিচারাধীন অবস্থায় কলকাতা প্রেসিডেন্সি জেলে মৃত্যুবরণ করেন। একই গ্রামে কৈলাস সিংহের মত ইতিহাসকার ও পুরাতত্ত্ববিদও যেমন জন্মেছেন তেমনি জন্মেছেন দ্বিজদাস দত্তের মত শিক্ষাবিদ, দার্শনিক ও প-িত ব্যক্তিত্ব। উল্লাসকর দত্তের মত প্রতিভাবান বিপ্লবী যেমন জন্মেছেন তেমনি জন্মেছেন আধুনিক ব্যাংকিং জগতের প্রাণপুরুষ নরেন্দ্রচন্দ্র দত্ত। বাংলা সাহিত্যের স্বনামধন্য কথাসাহিত্যিক জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী এ গ্রামেরই সন্তান। এখানে না জন্মেও মামা বাড়ি কালিকচ্ছ বলে অহংকার করেছেন বিশ্ববিশ্রুত লেখক ও প-িত নীরদচন্দ্র চৌধুরী।
কালিকচ্ছের গৌরবগাথা লিখতে গেলে বইয়ের পর বই হবে। আমার বর্তমান প্রয়াস এ গ্রামের কৃতি কথাসাহিত্যিক জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীকে নিয়ে। আমৃত্যু নিজস্ব যাপিত জীবনের পাশাপাশি যিনি সাহিত্য চর্চা করে গেছেন। আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যের এক অন্যতম কথাসাহিত্যিক হলেন জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী। তিনি যেমন গল্প লিখেছেন তেমন লিখেছেন অনেক উপন্যাসও। তিনি লিখেছেন নিজের মতো সাহিত্যকে ভালোবেসে। মনের খেয়ালে একের পর এক সৃষ্টি করে গেছেন নানা গল্প, নানা উপন্যাস। তবুও তিনি সম্পূর্ণ আলাদা এক ব্যক্তিত্ব-এক ‘নিঃসঙ্গ লেখক’। খ্যাতিমান এই সাহিত্যিকের জন্ম ১৯১২ সালের ২০ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার, সরাইল উপজেলার, কালিকচ্ছ গ্রামে। পিতা অপূর্বচন্দ্র নন্দী ব্রাহ্মণবাড়িয়া হাই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন, তাঁর মায়ের নাম চারুবালা দেবী। জন্মের পর পিতামাতা কর্তৃক তাঁর নাম হয়েছিল ‘ধনু’। ছোট থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি ছবি আঁকা, সাহিত্যপাঠ করতে থাকেন। শুধু পড়াশোনা বা অঙ্কনবিদ্যায় নয়, ছোট থেকেই খুব ভালো আবৃত্তিও করতে পারতেন জ্যোতিরিন্দ্র। নির্জনতা জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর বরাবরই প্রিয় ছিল, আবাল্য নিঃসঙ্গ এই কথাশিল্পী অন্তর্ময়তায় আবিষ্ট হয়ে দিনরাত্রি চুপ করে বসে বসে ভাবতে ভালোবাসতেন। শখ ও শৌখিনতা বলতে তাঁর প্রায় কিছুই ছিল না। পঞ্চাশ বছর ধরে লিখেছেন কিন্তু কোনো গোষ্ঠীতে তিনি কখনও সংযুক্ত হন নি। তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা সত্তরের ওপর কিন্তু চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে মাত্র একখানি। তাঁর সৃষ্টিকর্ম বিশ্ববিজ্ঞালয়ে গবেষণার যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে অথচ আজ পর্যন্ত কোনো বাণিজ্যিক মাপে স্থান পায়নি তাঁর কোনো উপন্যাস যা গল্প। কলকাতার সব কয়টি প্রতিষ্ঠিত পত্র-পত্রিকায় প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে লিখলেও তিনি মাত্র একবারের বেশি পুরস্কৃত হননি।
তাঁর সাহিত্যের অবয়বে আদ্য জড়ানো রয়েছে প্রকৃতির আবরণ আর সেই প্রকৃতিকে পটভূমিতে রেখে নর-নারীর পারস্পরিক সম্পর্কের মূল্যায়ন করেছেন তিনি বারবার। অনেকগুলো হত্যার সঙ্গে সুন্দর ফুল ও চমৎকার পাখির সহবাস ঘটিয়ে, কখনও বা অনেকগুলো অপরিণত মৃত্যুর সঙ্গে ঈশ্বর বিশ্বাসী মানুষের সংগ্রামের বিশ্বস্ত দলিল রচনা করে জ্যোতিরিন্দ্র পাঠককে বিস্ময়ে অভিভূত করেন। কাচের পাত্রের মতো স্নেহ-মায়া-মমতা গুঁড়িয়ে দিয়ে যারা ঈপ্সিত জগৎ গড়ে তোলে, তাদের সামনে প্রতিবাদী মূর্তির মতো ভালোবাসার ভেলায় ভাসতে ভাসতে অন্ধকারের অতলে তলিয়ে-যাওয়া অজস্র চরিত্র সৃজনেও তিনি ক্লান্তিহীন। একদিকে প্রচুর হত্যা, অনেক মৃত্যু, অবিমিশ্র বীভৎসতা, অবিরত ক্রন্দন-অন্যদিকে ফুল-পাখি-সমুদ্র-জ্যোৎন্সা ও বৃষ্টির সমারোহ মিলে তাঁর লেখায়। আদিম মানুষ ও আদিম প্রকৃতির দ্বৈত সমাবেশ তিনি ঘটাতে পেরেছেন শৈল্পিকভাবে।
সৃজনশীলতায় দ্বিতীয় বিধাতারূপে আত্মপ্রকাশের আগে নিতান্ত শৈশব থেকে কৈশোরের স্বপ্নরঙিন দিনগুলোর গন্ডী না পেরোনো পর্যন্ত জ্যোতিরিন্দ্র প্রকৃতির রূপ-রস-সুধা আকণ্ঠ পান করতেন সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে। নিতান্ত শৈশবে ধনু নামক যে-শিশুটি মেঘলা আকাশের মতো মুখভার করে ঘুরে বেড়াত, তাকে দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনের দৃশ্য বা তিতাদের জলে নৌকো-বাইচের সুতীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা আকর্ষণ করত না। অথচ যে আকর্ষণ বোধ করত খেজুর আর ভালগালা-ছড়ানো একটা শ্যাওড়া গাছের পিছন থেকে লাল টক্টকে আকাশের দিকে তাকিয়ে সুর্যাস্ত দেখতে, তেমনই গভীর-গম্ভীর ধনু ওরফে জ্যোতিরিন্দ্রকে নিয়ে কারও কোনো আগ্রহ ছিল না।
১৯৩০ খ্রি. ব্রাহ্মণবাড়িয়া অন্নদা উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। এরপর তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে আই সি এস পরীক্ষায় সাফল্য লাভ করেন। কল্লোল যুগের অন্যতম সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ তাঁর ছোটবেলা থেকেই। লেখালেখি শুরু ছাত্রজীবন থেকেই। ঐ সময়কাল থেকেই তিনি কুমিল্লার সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সময়কালটা ১৯৩২ খ্রি.। এই সময়েই রাজনৈতিক কার্যকলাপে যুক্ত থাকার অভিযোগে তাঁকে কারাবরণ করতে হয় ।
তিনি ঢাকার ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকায় গল্প লিখেছেন জ্যোৎস্না রায় ছদ্মনামে। পরবর্তীকালে কলকাতার বিভিন্ন সাপ্তাহিক যেমন ‘সংবাদ’, ‘আত্মশক্তি’, ‘নবশক্তিতেও লিখেছেন নানা গল্প। কিন্তু ‘পূর্বাশা’র সঞ্জয় ভট্টচার্য আর ‘দেশ’-এর সাগরময় ঘোষের হাত ধরেই বাংলা সাহিত্য জগতে তাঁর যথার্থ পদার্পণ। ১৯৩৬ খ্রি. ‘দেশ’-এর পাতায় প্রকাশিত হয় তাঁর ‘রাইচরণের বাবরি’। ‘পূর্বাশা’য় প্রকাশিত হয় তাঁর গল্প ‘অন্তরালে’।
১৯৩৬ সালে কর্মসূত্রে কলকাতা যান। প্রথম চাকরি পান বেঙ্গল ইমিউনিটিতে। একপর্যায়ে যুগান্তর ও মৌলানা আজাদ খান সম্পাদিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন। যেহেতু ছোটবেলা থেকেই জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী সাহিত্যচর্চা করতেন সেহেতু কলকাতায় এসে সাগরময় ঘোষের সান্নিধ্যে আসেন ও দেশ পত্রিকায় ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয় ছোটগল্প-রাইচরণের বাবরি। মাতৃভূমি, ভারতবর্ষ, চতুরঙ্গ, পরিচয় ইত্যাদি পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। এক সময় প্রেমেন্দ্র মিত্রের নজরে আসে জ্যোতিরিন্দ্রর লেখা। তাঁর লেখা ছোটগল্প-ভাত ও গাছ, ট্যাক্সিওয়ালা, নীল পেয়ালা, সিঁদেল, একঝাঁক দেবশিশু ও নীলফুল এবং বলদ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনুদিত হয়। ১৯৪৮ সালে দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক উপন্যাস সূর্যমুখী প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে তিনি সাহিত্যচর্চাকেই জীবিকা হিসেবে বেছে নেন। জ্যোতিরিন্দ্র ১৯৬৫ সালে আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে সুরেশচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার ও ১৯৬৬ সালে আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত হন।
জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর গল্পগ্রন্থের সংখ্য তিপান্নটি আর উপন্যাস আছে বিশটি। তাঁর প্রথম গল্প সংকলন ‘খেলনা’ (১৯৪৬) ‘পূর্বাশা’র সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্যের উদ্যোগে প্রকাশিত হয়। আর প্রথম উপন্যাসের নাম ‘সূর্যমুখী’ (১৯৫১)। তাঁর অনন্য কয়েকটি গল্পগ্রন্থের নাম শালিক কি চড়–ুই (১৩৬১ বঙ্গাব্দ), চন্দ্রমল্লিকা (১৩৫৩বঙ্গাব্দ), চারইয়ার (১৩৬১ বঙ্গাব্দ), বনানীর প্রেম (১৩৬৪ বঙ্গাব্দ), মহিয়সী (১৩৬৭ বঙ্গাব্দ), ছিত্র (১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
তাঁর অনন্য কয়েকটি উপন্যাস হল-মীরার দুপুর (১৯৫৩), বারো ঘর এক উঠোন (১৯৫৫), নীল রাত্রি (১৯৫৮), আলোর ভুবন (১৯৬২), আকাশলীনা (১৯৬৪), প্রেমের চেয়ে বড় (১৯৬৬), সুনন্দার প্রেম (১৯৬৭) ইত্যাদি।
দীর্ঘদিন অন্ত্রের কর্কট রোগে অসুস্থ ছিলেন তিনি। ১৯৮২ সালের ১ আগস্ট কলকাতার হ্যারিংটন নার্সিংহোমে খ্যাতিমান এ কথাসাহিত্যিক মৃত্যুবরণ করেন।

লেখক : আমির হোসেন, কথাসাহিত্যিক
চেতনায় স্বদেশ গণগ্রন্থাগার, শিমরাইলকান্দি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।