দীপ্তর আত্মদর্শন ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চিত্রশিল্প দর্শন🔲মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ

জনতার কন্ঠ, 19 May 2024, 211 বার পড়া হয়েছে,

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন স্পেন ভ্রমণে গিয়ে বেশ বিপদে পড়লেন। খাবার জন্য তিনি এক রেস্টুরেন্টে গিয়েছেন কিন্তু তিনি নিজে স্প্যানিশ ভাষা জানতেন না, আর সেই রেস্টুরেন্টের কেউ ইংরেজি ভাষা জানতো না। ফলে তিনি কি খাবেন তা বোঝাতে পারছেন না কাউকে।

শেষে বুদ্ধি করে তিনি তার ব্যাগ থেকে স্কেচ খাতা বের করে সাদা কাগজের একপাশে একটি সিদ্ধ করার কড়াই এবং একটি ভাজি করার কড়াই আঁকলেন। তারপর একটি বড় গরু, পাশে গরুর পেছনের রান এঁকে তীর চিহ্ন দিয়ে সিদ্ধ করা কড়াইয়ের দিকে দেখালেন। অর্থাৎ, রানের মাংস রান্না খেতে চান। একে একে মুরগির ডিম, কপি, আলু যা যা খাবার প্রয়োজন সব এঁকে ফেললেন।

স্প্যানিশ ওয়েটারের আর বুঝতে অসুবিধা হলো না যে শিল্পী কী খেতে চান। তারপর থেকে এভাবেই চলতে লাগলো ছবি এঁকে খাবার অর্ডার দেওয়ার তার এক নতুন পদ্ধতি । জয়নুল আবেদিন এরপর বিদেশে পথ চলতে আর খুব একটা অসুবিধেয় পড়েননি। কারণ সঙ্গে থাকতো তার স্কেচ খাতা আর পেন্সিল। যে কোন ভাষাভাষীর সঙ্গে ছবি এঁকে ভাবের আদান-প্রদান করে নিতেন, ছবির ভাষা দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতেন।

পৃথিবীতে বর্তমানে ৭০৯৯টি ভাষা প্রচলিত আছে। না শিখলে না জানলে এক ভাষার মানুষ আরেক ভাষা বুঝতে পারে না। ব্যতিক্রম শুধু ছবির ভাষা। ছবি বা চিত্রকর্ম এমন এক ভাষা পৃথিবীর যেকোনো দেশের যেকোনো ভাষার লোক এর মর্মার্থ অনেকটাই বুঝতে পারে। ফলে দেশে দেশে ছবি আঁকার উপর জোর দেন সেখানকার অধিবাসীরা।

বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল এই প্রতিভার খ্যাতি রয়েছে বিশ্বজুড়ে। মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, পাবলো পিকাসো, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি থেকে শুরু করে আমাদের জয়নুল আবেদিন, এসএমএস সুলতান, কাইয়ুম চৌধুরীরা যুগ যুগ ধরে মানুষের কাছে নমস্য। খ্যাতির সাথে রয়েছে এর শিল্প ও অর্থ মূল্যও।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় গত ১৮ মার্চ ২০২৪ তারিখে নিউইয়র্কে এক নিলামে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের দুইটি চিত্রকর্ম রেকর্ড দামে বিক্রি হয়েছে। ‘সাঁওতাল দম্পতি’ নামের একটি চিত্রকর্ম তিন লাখ ৮১ হাজার মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়েছে, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা চার কোটি ১৭ লাখ সাড়ে ছয় হাজার টাকা। দ্বিতীয় পেইন্টিংটি বিক্রি হয় দুই লাখ ৭৯ হাজার ৪০০ মার্কিন ডলার বা তিন কোটি ছয় লাখ টাকার কিছু বেশি।

সংস্কৃতির রাজধানী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চিত্রশিল্পের প্রাচীন ইতিহাস না পাওয়া গেলেও বিখ্যাত ভারতীয় চিত্রশিল্পী ধীরাজ চৌধুরী যার জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে বলে জানা যায় (জন্ম: ১ এপ্রিল ১৯৩৬, মৃত্যু ১ জুন ২০১৮। তাঁর পরবর্তীতে জেলার চিত্রশিল্প চর্চা ও বিকাশে কবি জমিলা খাতুনের ছেলে চিত্রশিল্পী নিজাম ইসলাম ও মুখ বধির স্কুলের চিত্র প্রশিক্ষক আক্তারুজ্জামান ও সাইনবোর্ড অঙ্কন শিল্পী এম কামালের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারা সবাই প্রয়াত হয়েছেন। এদের পরবর্তী প্রজন্ম শিশু একাডেমির চিত্র প্রশিক্ষক ফজলুর রহমান মুকুল, আশরাফ পিকো, আল আমিন শাহিন ও শিশু নাট্যমের প্রশিক্ষক বাবুল মিয়া উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নাম।

১৯৮৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শিশু নাট্যম প্রতিষ্ঠিত হলে এর প্রতিষ্ঠাতা নিয়াজ মোহাম্মদ বিটুর তত্ত্বাবধান ও পৃষ্ঠপোষকতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চিত্রশিল্পের ব্যাপক চর্চা ও বিকাশ সাধিত হয়। গত কয়েক দশকে এই প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য শিক্ষার্থী জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে নিজ নিজ চিত্রশিল্পের মাধ্যমে সুনাম অর্জন করেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শিশু নাট্যম ছাড়াও বর্তমান জেলা শিশু একাডেমি, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, হাতেখড়ি আর্ট একাডেমি, প্রত্যাশা আর্ট স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের ছবি আঁকা শেখানো হয়।

সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া শিশু নাট্যমের সাবেক শিক্ষার্থী এবং বর্তমান প্রশিক্ষক দীপ্ত মোদকের আত্মদর্শন নামে একক চিত্র প্রদর্শনী হলো স্থানীয় শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা চত্বরে। ১২ই মে থেকে ১৭ই মে পর্যন্ত ৫ দিনব্যাপী এই প্রদর্শনীতে দীপ্ত মোদকের আঁকা ৩০টি চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়। স্থানীয় চিত্রশিল্পীসহ শিল্পবোদ্ধা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ, সুধীজন, লেখক, সাংবাদিক এবং প্রশাসনের ব্যক্তিদের কাছে এই প্রদর্শনীটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

জল রঙে আঁকা এই ছবিগুলো বাংলাদেশসহ নেপাল, ভুটান এবং ভারতের সিক্কিম, দার্জিলিংসহ বিভিন্ন স্থানের প্রাকৃতিক নৈসর্গিক দৃশ্য নিপুণ ভাবে ফুঁটিয়ে তোলা হয়েছে। দীপ্ত সে স্থানগুলো ভ্রমণের সময় আউটডোর ওয়ারর্কের অংশ হিসেবে ছবিগুলো আঁকে। ছবি আঁকায় সে ব্যবহার করেছে জিয়াকিন পেপার, ফেভরি আনো পেপার, চিত্রপট পেপার এবং হ্যান্ডমেড কার্টিজ পেপার। ছোট বড় মাঝারি বিভিন্ন সাইজের ছবিগুলো ফ্রেম বন্দি করতে তাকে সহযোগিতা করেছে তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী। স্বামীর প্রদর্শনীতে স্ত্রীর সহযোগিতা সত্যিই অসাধারণ ব্যাপার।

১৫-১৬ বছর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় কয়েকটি ছেলে মেয়েকে দেখতাম সব সময় তারা প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় হচ্ছে। দীপ্ত মোদক, জুবায়ের আহমেদ, আফ্রিদি করিম হিমেল, ইসরাত জাহান আর্তি, শায়লার রেশমি, সেঁজুতি তাদের অন্যতম। এদের কেউ কেউ এখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিজ নিজ কাজের মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সুনাম ছড়াচ্ছে। দীপ্ত তাদের মধ্যে অন্যতম।

দীপ্তির এই একক চিত্র প্রদর্শনী গত দের দশকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রথম। ২০০৯/১০ সালে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে তিন তরুণের চিত্র প্রদর্শনী হয়েছিল। এরপর আর কোনো চিত্র প্রদর্শনী হতে দেখিনি। তার আগে হয়ে থাকলে তা আমার জানা নেই। তবে শিশু নাট্যমের ক্ষুদে শিল্পীদের চিত্রকর্ম নিয়ে প্রতি বছরই বেশ বড়সড়ো চিত্র প্রদর্শনী হয়ে থাকে। এ উপলক্ষে থাকে ব্যাপক আয়োজন।

সৃজনশীল মেধার প্রকাশ, সময়কে ধারণ করে রাখা এবং ইতিহাস, ঐতিহ্য রক্ষায় এই সমস্ত শিল্পকর্মে শিক্ষার্থীদের উৎসাহী করতে আমাদের সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে। যে সমস্ত ছেলে মেয়েরা ছবি আঁকায় আগ্রহী তাদেরকে হাতে কলমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাসহ যারা ভাল ছবি আঁকেন ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে তাদের ছবিগুলো সংরক্ষণ করতে হবে ।

জেলার সকল সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চিত্র শিল্পীদের আঁকা ঐতিহাসিক, নান্দনিক এবং তাৎপর্যপূর্ণ ছবিগুলো ক্রয় করে এ সকল প্রতিষ্ঠানে দর্শনীয় স্থানে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করলে একদিকে চিত্রশিল্পীরা সৃজনশীল কাজে আগ্রহী হবেন, অন্যদিকে তাদের জীবিকার একটা ব্যবস্থা হবে। পাশাপাশি জেলার ইতিহাস ঐতিহ্যও রক্ষা পাবে। বিভিন্ন কাজে নিজ জেলা এবং অন্য জেলার মানুষরা যারা সেসব প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে আসে তাদের কাছে জেলা ঐহিত্যর প্রচার-প্রকাশ হবে।

আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতি বছর ঈদ কার্ড, নববর্ষ কার্ডসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণপত্রে প্রতিবন্ধীদের আকা ছবি ব্যবহার করে থাকেন। এই বিষয়টিকে অনুকরণ করে গত বছর এবং এই বছর রোজার ঈদ ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা কর্তৃক বিতরণকৃত ঈদ কার্ডে স্থানীয় দুজন ক্ষুদে শিল্পীর ছবি ব্যবহার করেছে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। যার অন্যতম উদ্যোক্তা সম্মানিত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আ. কুদ্দুস মহোদয়। এই বিষয়টি অনুসরণ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনসহ অন্যান্য সরকারি সরকারি বেসরকারি অফিস প্রধানদের কাছেও আমরা অনুরোধ করব জেলার শিল্পকর্ম পৃষ্ঠপোষকতায় এই উদ্যোগটি গ্রহণ করার জন্য।

আধ্যাত্মিকতায় ‘আত্মদর্শন’ তথা নিজেকে জানা, নিজেকে চেনা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কনসেপ্ট। দীপ্ত তার চিত্র প্রদর্শনীর নাম রেখেছে ‘আত্মদর্শন’। ছবি যেখানে জীবন-জীবিকা, পরিবেশ-প্রকৃতি ও সময়ের কথা বলে। সেখানে আত্মদর্শন বলতে দীপ্ত আসলে বোঝাতে চেয়েছে ছবি আঁকার মাধ্যমে- আমি জীবন জীবিকা, পরিবেশ প্রকৃতি ও সময়কে দেখি এবং তার মাধ্যমে নিজেকে খুঁজি। এর এর মাধ্যমেই নিজেকে চিরজীবন স্মরণীয় করে রাখতে চাই। আশার কথা এই প্রদর্শনীতে দীপ্তর ১৫ টি ছবি বিক্রয় হয়েছে। কোনো কোনেটির টাকার মূল্য ৮ হাজার ।

গতকাল দীপ্ত মোদকের এই চিত্রকর্ম প্রদর্শনের সময় আমার সঙ্গে ছিল কবি ও গল্পকার শাদমান শাহিদ, কবি ও সম্পাদক হেলাল উদ্দিন হৃদয়, কবি শামসুজ্জোহা এবং শিল্পী দীপ্ত, তার স্ত্রী ও দা- বৌদি।

মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ (লেখক, সম্পাদক, সংগঠক)
১৮ মে ২৪
বিশেষ দ্রষ্টব্য এই নিবন্ধটি পরবর্তীতে আরো সংযোজন, বিয়োজন ও সংশোধন করা হবে।