বুবি আমাদের ক্ষমা করেননি: বিবেকহীন এক সমাজের উপাখ্যান

মতামত, 8 July 2026, 18 বার পড়া হয়েছে,

অবশেষে গত রাত ১:১৫ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মেথিকান্দা রেল স্টেশনের সেই চিরপরিচিত অসহায় বৃদ্ধা—সবার প্রিয় ‘বুবি’। তবে সত্য কথাটি হলো, তিনি শুধু মারা যাননি; বরং আমাদের সামগ্রিক মানবিকতার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়ে, এই পঙ্গু সমাজের মুখে এক চরম চড় মেরে বিদায় নিয়েছেন।

​মেথিকান্দা রেলস্টেশনে একজন বৃদ্ধ, অসহায় ভিখারীর ওপর যে নির্মম ও পৈশাচিক বর্বরতা চালানো হলো, তার রক্তমাখা অবয়ব দেখেও কি আমাদের সুপ্ত বিবেক একটুও কেঁপে ওঠেনি?

​কোনো এক নরপশু নৃশংসভাবে আঘাত করে বুবির সারাজীবনের সম্বল—ভিক্ষা করে জমানো সামান্য কয়টি টাকা ছিনিয়ে নিল। আর আমরা? আমরা কেবল দর্শক হয়ে রইলাম।

​তবে সবচেয়ে লজ্জাজনক এবং ঘৃণ্য অধ্যায়টি রচিত হয়েছে ঘটনার পর। রক্তাক্ত বুবিকে দ্রুত উদ্ধার করে সুচিকিৎসা দেওয়া কিংবা অপরাধীকে পাকড়াও করার কোনো কার্যকরী উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ছিনতাই হওয়া টাকা উদ্ধারেও মেলেনি কোনো অগ্রগতি। অথচ একদল মানুষের ঢল নেমেছিল সেখানে! কিসের জন্য জানেন? রক্তাক্ত বুবির পাশে দাঁড়িয়ে মুঠোফোনে ছবি তোলার জন্য!

​কয়েকটা টাকা ছুড়ে দিয়ে, সেই মুমূর্ষু নারীর রক্তমাখা চেহারার সাথে সেলফি বা ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করে ‘মানবিকতার’ সস্তা বাহবা কুড়াতেই ব্যস্ত ছিল সবাই। মনের ভেতর প্রশ্ন জাগে—সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক-কমেন্টের ব্যবসা করলেই কি দায়িত্ব শেষ? ছিঃ! এই কি আমাদের শিক্ষা? এই কি আমাদের হাজার বছরের মূল্যবোধ? নিজের বিবেকের কাছে, এই জাতির কাছে আজ আমরা কী জবাব দেব?

​এজন্যই কি এই সমাজের সুধীজনেরা এত পড়াশোনা করেছেন? শেষ পর্যন্ত সমাজে টিকে থাকার জন্য একজন নিঃস্ব বৃদ্ধ ভিখারীর টাকাটাও কেড়ে নিতে হলো? তাও আবার তার মুখে নির্মমভাবে আঘাত করে!

​যেই অমানুষ বা অমানুষেরা এই বৃদ্ধাকে এভাবে আঘাত করেছে, তারা নিশ্চয়ই অন্য কোনো গ্রহ থেকে আসেনি। সে হয়তো এই দেশেরই, এই জেলারই, কিংবা মেথিকান্দা রেলস্টেশনের আশপাশেরই কেউ। আমাদের চোখের সামনেই হয়তো সে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, অথচ তাকে আইনের আওতায় আনার কোনো তাগিদ কারও নেই।

বুবির এই বিদায় এই এলাকার সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেল—এখানে একজন নিঃসহায় বৃদ্ধ ভিখারীও নিরাপদ নয়। যারা এই কাজ করেছে, তারা মানুষ নামের কলঙ্ক; এরা জানোয়ার বা হায়েনার চেয়েও নিকৃষ্ট।

​শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বুবির কোনো আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ পাওয়া যায়নি। তিনি কাউকেই পাশে পাননি—না কোনো আপনজন, না কোনো সমাজপতি, না কোনো কার্যকর ন্যায়বিচার। এক বুক অভিমান, অবহেলা আর বিচারহীনতার তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে তিনি এই নিষ্ঠুর দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিলেন।

জানা গেছে, প্রায় ২৫ বছর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ থেকে মেথিকান্দা রেলস্টেশনে এসে আর ফিরে যাননি বুবি বেগম। স্টেশনটিই হয়ে ওঠে তাঁর স্থায়ী ঠিকানা। কোনো বেতন-ভাতা ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে প্ল্যাটফর্ম, শৌচাগার ও স্টেশন চত্বর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতেন তিনি। মানবিক কারণে স্টেশন কর্তৃপক্ষ তাঁকে একটি পরিত্যক্ত কক্ষে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। যাত্রী ও স্থানীয় মানুষের দেওয়া সামান্য সহায়তায় চলত তাঁর জীবন।

​আজ বুবির এই চলে যাওয়া আমাদের থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। এ কেমন এক ভণ্ড সমাজে আমরা বাস করছি, যেখানে আসল মানবিকতা মরে গেছে আর কৃত্রিম মানবিকতা সস্তা ফেসবুক পোস্টের ফ্রেমে বন্দি? আজ বুবির আত্মার চিৎকার আমাদের অবক্ষয়িত সমাজকে লক্ষ্য করে যেন একটাই চিরন্তন আর্তি আওড়ে যাচ্ছে— ​“আবার তোরা মানুষ হ।”

আদিত্য কামাল, সম্পাদক জনতার খবর