জলদাস সম্প্রদায়ের সার্থক রূপচিত্র ‘তিতাস একটি নদীর নাম’- আমির হোসেন

সাহিত্য, 31 December 2025, 186 বার পড়া হয়েছে,

জনতার খবর : তিতাসের তনুদেহ ঘিরে যে কবিতার রূপোচ্ছাস অদ্বৈত ছড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর উপন্যাস “তিতাস একটি নদীর নাম” এর সর্বাঙ্গে তার জুড়ি মেলা ভার। অদ্বৈত মল্লবর্মণ পত্রিকায় চাকরিসূত্রে কলকাতায় জীবন-যাপন করলেও তাঁর শিক্ষা জীবন কেটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লাতে। এখানেই গড়ে উঠেছে তাঁর লেখক মানস। আক্ষরিক অর্থেই তিনি তিতাসের সন্তান। তিতাসের কোলে তাঁর জন্ম, তিতাসের তীরে তাঁর বেড়ে ওঠা, তিতাসের উপকূলে তাঁর বিচরণ-বিকাশ। তিতাসে সঙ্গে গভীর মিতালি করে কেটেছে তাঁর শৈশব-কৈশোর-তারুণ্য। তাঁর কৌম-জ্ঞাতিগোষ্ঠী-আত্মীয়-পরিজন সহচর সকলেরই বসবাস ও বিচরণ তিতাস তীরে। তাই তাঁর শোনিতে তিতাসের প্রবাহ, নাড়িতে তিতাসের ঢেউয়ের স্পন্দন আর চিত্তে তিতাসের জীবনপ্রবাহ। তাঁর সাহিত্যিক জীবনের সূচনাতেও তিতাস সমাপ্তিতেও তিতাস। তাঁর জীবনই তিতাসময়। তাই অদ্বৈত মল্লবর্মণ তিতাসের সন্তান হয়েও তিতাসের জনক।
অদ্বৈত মল্লবর্মণের সমগ্র সাহিত্যিক জবিনে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসটি অমর কীর্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রতিকূল সংঘাতে ক্রমশ মুছে-আসা মৎসজীবী যে মানুষদের কাহিনী এ উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে তিনি সেই ‘মালো’ সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সুগভীর অন্তঃদৃষ্টির কারণেই উপন্যাসটিতে ধীবর সমাজের নিষ্ঠুর জীবনসংগ্রামের সাধারণ কাহিনীকে করে তুলেছেন অবিনশ^র ও অসাধারণ। তিতাস নদী ও তার দু‘কূলের মানুষের জীবনযাত্রাকে ঘিরে রচিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে কিশোর, সুবল, অনন্ত, বনমালী, রামপ্রসাদ, দয়ালচাঁদ প্রমুখ চরিত্রগুলি স্থান পেয়েছে।
গ্রন্থাকারে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ যেভাবে পাওয়া গেছে, তাতে আছে চারটি খ-; সংখ্যাচিহ্নিত প্রতিটি খ-ে রয়েছে দুটি করে পর্ব। প্রথম খ-ের পর্বদ্বয়ের নাম-‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ও ‘প্রবাস খ-’। দ্বিতীয় খ-ের পর্বদ্বয় হচ্ছে ‘নয়াবসত’ ও ‘জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ’। তৃতীয় খ-ে আছে ‘রামধনু’ ও ‘রাঙা নাও’ আর চতুর্থ খ-ে ‘দুরঙা প্রজাপতি’ ও ‘ভাসমান’।
তিতাসের সংবেদনময় উপস্থাপন দিয়ে শুরু হয় আলোচ্য উপন্যাস। অদ্বৈতর বর্ণনায় তিতাস হয়ে ওঠে কর্মাত্মক-সমরেশ বসুর গঙ্গা, বিভূতিভূষণের ইছামতি, এমন-কি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মতো অদ্বৈতের তিতাস নিস্ক্রিয় পরিপ্রেক্ষিত মাত্র নয়। বর্ণিতব্য বিষয় ও চরিত্রসমূহকে যেহেতু নিয়ন্ত্রণ করবে তিতাস, তাই প্রথমেই লেখক তুলে ধরেছেন তিতাসের স্বতন্ত্র চারিত্র্য- ‘তিতাস একটি নদীর নাম। তার কূলজোড়া জল, বুকভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছ্বাস। . . . মেঘনা-পদ্মার বিরাট বিভীষিকা তার মধ্যে নাই। আবার রমু মোড়লের মরাই, যদু প-িতের পাঠশালার পাশ দিয়ে বহিয়া যাওয়া শীর্ণ পল্লীতটিনীর চোরা কাঙ্গালপনাও তার নাই। তিতাস মাঝারি নদী। দুষ্ট পল্লীবালক তাকে সাঁতরাইয়া পার হইতে পারে না। আবার ছোট নৌকায় ছোট বউ নিয়া মাঝি কোন দিন ওপারে যেতে ভয় পায় নাই। তিতাস শাহী মেজাজে চলে। তার সাপের মতো বক্রতা নাই, কৃপণের মতো কুটিলতা নাই। কৃষ্ণপক্ষের ভাঁটায় তার বুকের খানিকটা শুষিয়া নেয়, কিন্তু কাঙ্গাল করে না। শুক্লপক্ষের জোয়ারের উদ্দীপনা তাকে ফোলায়, কিন্তু উদ্বেল করে না।’
প্রথম খন্ডের প্রথম পর্বটি একান্তই তিতাসকেন্দ্রিক-অদ্বৈত সচেতনভাবে প্রথমেই নির্মাণ করে নেন তাঁর অন্বিষ্ট প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপট। তাঁর বিবরণ পাঠ করে প্রাকৃত জীবন ও তিতাসের অর্ন্তবয়ন সম্পর্কে পাঠক মুহূর্তেই হয়ে ওঠে সচেতন-বোঝা যায় তিতাস নদী যে তার তীরবর্তী প্রাকৃত জীবনের কোষে-কোষে মিশে আছে সে-কথাই লেখক ব্যক্ত করতে চান এখানে- ‘তিতাস একটি নদীর নাম।.. .. নামটি তাদের কাছে বড় মিঠা। তাকে তারা প্রাণ দিয়ে ভালবাসে, তাই এই নামের মালা তাদের গলায় ঝুলানো। শুরুতে কে এই নাম রাখিয়াছিল, তারা তা জানে না। তার নাম কেউ কোনদিন রাখিয়াছে, এও তারা ভাবে না। ভাবিতে বা জানিতেও চায় না। এ কোনদিন ছিল না, এও তারা কল্পনা করিতে পারে না। কবে কোন দূরতম অতীতে এর পারে তাদের বাপ পিতামহেরা ঘর বাঁধিয়াছিল একথা ভাবা যায় না। এ যেন চির সত্য, চির অস্তিত্ব নিয়া এখানে বহিয়া চলিয়াছে। এ সঙ্গী তাদের চিরকালের। এ না হলে তাদের চলে না। এ যদি না হইত, তাদের চলিতও না। এ না থাকিলে তাদের চলিতে পারে না। জীবনের প্রতি কাজে এ আসিয়া উঁকি মারে। নিত্যদিনের ঝামেলার সহিত এর চিরমিশ্রণ। এভাবে লেখক মূল প্রতিবেদনের প্রস্তুতি হিসেবে প্রাকৃত জীবনের সঙ্গে ব্রাত্য নদী তিতাসকে একাত্ম করে নেন।
প্রথম খ-ের দ্বিতীয় পর্বের নাম ‘প্রবাস’। সুবল, তিলক, কিশোর, মোড়ল, বাসন্তী, বেদেনী তরুণী-এসব ব্যক্তির সঙ্গে এ পর্বে পাঠকের পরিচয় ঘটে। এদের সঙ্গে-সঙ্গে পাঠকও লৌকিক উপাদান ও কৌম-সংস্কৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়েন এ পর্বে। কিশোরের প্রেম, আকস্মিক বিয়ে, মেঘনায় ডাকাত কর্তৃক তার স্ত্রীর অপহৃত হওয়া এসব ঘটনা উপন্যাসে অনিবার্য অনুষঙ্গ। তবু এ পর্বেই অদ্বৈত নির্মাণ করে নেন প্রাকৃত জীবন