পহেলা বৈশাখ বাঙালীর জাতিস্বত্বার সাথে মিশে একাকার হয়ে আছে, আমি বাঙালী আমি বাংলাদেশী এই আমার পরিচয়। ১৯৬৮ সালে যখন ছায়ানটের হাত ধরে পাকিস্তানি শাসকদের রক্তচক্ষু অপেক্ষা করে রমনার বটমূলে বর্ষবরণ উৎসব শুরু হয় তা থেকেই বৈশাখ পালনে আনুষ্ঠানিকতা প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে রুপ নেয়। আজকে পহেলা বৈশাখ মানুষের দ্বারঘোরে পৌঁছে গেছে। কিন্তু পক্ষান্তরে মোটাদাগে একটা প্রশ্ন রেখে দিতে চাই পাঠকদের জন্য আমরা বাঙালীর যে চেতনাবোধের জায়গা শিকড়ের মূল বৈশাখকে অসাম্প্রদায়িক ভাবে সর্বস্তরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে পালনে সক্ষম হয়েছি? সহজ উত্তর হয়তো পাড়িনি, তার কারন পুলিশি পাহারায় প্রচুর নিরাপত্তার বেষ্টনীতে বৈশাখের মঙ্গলশোভা যাত্রা দেখলেই বুঝা যায় কত খানি প্রাননাশের আতংক আর উৎকণ্ঠা নিয়ে মঙ্গলশোভা যাত্রাতে আমরা অংশগ্রহণ করি। উৎসব হবে প্রানবন্ত যেখানে কোন ভয়, উৎকণ্ঠা, আতংক থাকবে না।
একাল সেকাল দুইকালে বৈশাখ পালনে বিস্তর ফারাক লক্ষনীয়ভাবে প্রতিফলিত হয়। উদাহরণ স্বরুপ আগে বৈশাখী উৎসব গুলোতে কেমন জানি একটা প্রানের স্পন্দন খুঁজে পাওয়া যেতো, সবকিছুতে স্নিগ্ধতা ছিল, বাঙালীয়ানা ছিল। প্রভাতের প্রথম প্রহরেই উৎসব শুরু হয়ে যেতো কিন্তু এখন বেশ দেরি করেই শুরু হয় তা ও আমাদের আধুনিকতার কারনেই বোধয়। কিন্তু একালের সবকিছুতে একটা কৃত্রিমতা কাজ করে।মনে হয় জোর করে আমরা একদিনের বাঙালী হওয়ার চেষ্টা করছি যা আগে ছিল না। আগে এত নিরাপত্তায় পুলিশি পাহারায় মঙ্গলশোভা যাত্রা হতো না, এখন কেমন জানি ভয় আতংকের মাঝে বৈশাখী উৎসব পালন হয়। এসব বিষয় রাষ্ট্রের জন্য হুমকি স্বরূপ। যে উৎসব ভয় উৎকন্ঠা নিয়ে মানুষকে পালন করতে হয় তা আর উৎসব থাকে না। হারিয়ে গেছে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য। মৃদশিল্প, হাতে বানানো হরেক রকম পিঠার বাহার, লোকজ শিল্প, পোষাক পরিচ্ছদ, সাজসজ্জায়ও বেশ পরিবর্তন এসেছে।
রবীন্দ্র সংগীতের সাথে এখন স্থা ন পায় রক মিউজিকও আর জারি-সারি কেবল গল্পের লিখায় আবদ্ধ বাউল আর এক তারা তো হারিয়েই গেছে যেদিন কিছু কুলাঙ্গার বাউলদের মাথা নেড়া করে গোফ দাঁড়ি কেটে দিয়েছিল।
গ্রামীণ জনপদে আগের মত পহেলা বৈশাখ পালনের চিত্র ফুটে উঠে না, কেমন জানি স্তব্ধ হয়ে গেছে সবাই। ধর্মের দোহায় দিয়ে কারা জানি তাদের শিখিয়ে দিয়েছে পাপ পূন্যের হিসাব। তাই তো তারা নির্বাক, কিন্তু বিশ্বাস করেন তাদের হৃদয় আত্না আজও নেচে উঠে বাউলের গানে, জারি-সারির টানে, লাঠিখেলা, মুড়ির মোয়া, লুডুখেলা, পুতুল নাচ আর সাপখেলাতে। বৈশাখকে কেন্দ্র করে বাঙালীর ঐতিহ্য লোকজ সংস্কৃতি আজকে হুমকির মুখে।
নতুন প্রজম্মের কাছে কোন বাংলাদেশ আমরা রেখে যাচ্ছি, দ্বি-জাতি বিভক্ত বাংলাদেশ, ধর্মান্ধ বাংলাদেশ, সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ।
আসুন অন্ধকার থেকে বের করে নতুন আলোয় আলোকিত বাংলাদেশ রেখে যায় তাদের জন্য যেনো তারা ধার করা অপসংস্কৃতিতে আসক্ত না হয়, যেন তারা একতারা সুরের মাঠির গান না ভুলে রক মিউজিকে আসক্ত হয়।
আব্দুল মতিন শিপন, নান্দনিক উপস্থাপক