৭ ডিসেম্বর নাসিরনগর হানাদার মুক্ত দিবস ও কিছু কথা -এস এম শাহনূর

জনতার কন্ঠ, 6 December 2021, 495 বার পড়া হয়েছে,

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাস। এ মাসের প্রতি মুহূর্ত যেন ‘বাংলাদেশ’ সৃষ্টির কথা বলে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া বাঙালি এ মাসেই ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতার লাল সূর্য। প্রতিষ্ঠা করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগরের ইতিহাসে এ দিনটি বিশেষ স্মরণীয় দিন।
১৯৭১ সালের ১৫ নভেম্বর পাকহানাদার বাহিনী ও এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর,আল শামসের সহায়তায় উপজেলার ফুলপুর, নুরপুর, কুলিকুন্ডা, সিংহগ্রাম ও তিলপাড়া সহ বেশ কযেকটি গ্রামবাসীর উপর অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ নারকীয় তান্ডব চালায়। পাকবাহিনীর অমানবিক নির্যাতনে বহু লোক আহত ও নিহত হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও দেশপ্রেমিক সংগ্রামী জনতা পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই করে অবশেষে ৭ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা “জয়বাংলা-জয়বাংলা” শ্লোগানে মুখরিত করতে করতে এলাকায় ঢুকতে থাকে, ক্রমেই শ্লোগানের আওয়াজ স্পষ্ট হয়, কেটে যায় শংকা। মুক্তিযোদ্ধাদের কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে মুক্তির উল্লাসে মেতে উঠে সর্বস্তরের মানুষ। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীরা এগিয়ে যায় সামনের দিকে, পিছু হটে হানাদার বাহিনী। ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর এই দিনে মুক্তিযোদ্ধা ও সংগ্রামী জনতা নাসিরনগর থানা অভ্যন্তরে (পুলিশ ষ্টেশন) স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে নাসিরনগরকে হানাদার মুক্ত করেন। মুক্তিযোদ্ধের বীর সেনানীদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য ২০০৮ সালের ২৬ মার্চ উপজেলা পরিষদ চত্বরে স্মৃতি ফলকের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। উপজেলা পরিষদ চত্বরে স্মৃতি সৌধ নির্মাণ কাজও সম্পন্ন করা হয়।

৭ ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনী দেশের বেশ কয়েকটি জেলা শত্রুমুক্ত করে। আর মিত্রবাহিনী মুক্ত করে সিলেট শহরকে।এদিকে রণাঙ্গনে অর্জিত হচ্ছিল একের পর এক সাফল্য। সকল জায়গাতেই সামরিক পরাজয়ের মুখে পিছু হটছিল পাকিস্তানী সৈন্যরা। এদিন ভারত-বাংলাদেশ যৌথ সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সিদ্ধান্ত হয়, বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক লেঃ জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নেতৃত্বে। এর আগের দিন ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। আর পাহাড়ী রাষ্ট্র ভূটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে ৩ ডিসেম্বর। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরিস্থিতির ব্যাখ্যা গুরুত্ব লাভ করে।

ইন্দোনেশিয়ার পত্রিকা ইন্দোনেশিয়া রায়া’র ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত সংখ্যায় লেখা হয়, পাকিস্তানের উচিৎ বাংলাদেশকে মেনে নেয়া এবং নিজেদের ভুল সংশোধন করা। ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমেও বালাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে এদিন অভিমত প্রকাশ করা হয়। যেমন গার্ডিয়ান, দি টেলিগ্রাফ ও টাইমস। ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বলা হয়, বাস্তবতা হল, সদিচ্ছা ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া বাংলাদেশকে আর দমিয়ে রাখা যাবে না। এদিন পশ্চিম রণাঙ্গনেও ভারতীয় বাহিনীর ব্যাপক সাফল্য লক্ষ্য করা যায়। ভারতীয় নৌবাহিনীর দ্বারা করাচী বন্দর অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ভারতীয় জঙ্গী বিমান করাচীতে নির্বিচারে হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল। পাকিস্তানের আকাশে তাদের অবাধ তৎপরতার প্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান নিরাপত্তার জন্য ইসলামাবাদে প্রেসিডেন্ট হাউসের নিচে ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে আশ্রয় নেন।

৬ ও ৭ ডিসেম্বরের কোনো এক সময় যুদ্ধ পরিস্থিতির বিবরণ দিয়ে জেনারেল নিয়াজি গোপন বার্তা পাঠায় রাওয়ালপিণ্ডি হেডকোয়ার্টার্সে।

রিপোর্টে নিয়াজি উল্লেখ করেন, চারটি ট্যাংক রেজিমেন্ট সমর্থিত আট ডিভিশন সৈন্য নিয়ে আক্রমণ শুরু করেছে ভারত। তাদের সঙ্গে আরও আছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৬০ থেকে ৭০ হাজার বিদ্রোহী (মুক্তিযোদ্ধাদের পাকিস্তানিরা তখনও বিদ্রোহী উল্লেখ করত)।

নিয়াজি আরও লেখেন, স্থানীয় জনগণও আমাদের বিরুদ্ধে। দিনাজপুর, রংপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লাকসাম, চাঁদপুরে চাপের মুখে রয়েছি। পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠতে পারে। গত ১৭ দিনে যেসব খণ্ডযুদ্ধ হয়েছে তাতে জনবল ও সম্পদের বিচারে আমাদের ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে গেছে। রাজাকারদের অস্ত্রসহ সটকে পড়ার সংখ্যাও বাড়ছে।

এর মধ্যেই যশোরের পতন হয়, যা পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটিতে নাড়া দেয়। সাত তারিখেই গভর্নর আবদুল মালেক পূর্বাঞ্চলের সেনাপ্রধান লে. জে. নিয়াজির অভিমত উদ্ধৃত করে এক বার্তায় ইয়াহিয়াকে জানান, যশোরের বিপর্যয়ের ফলে প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলের পতন প্রায় সম্পন্ন এবং মেঘনার পূর্বদিকের পতনও কেবল সময়ের ব্যাপার।

এ অবস্থায় ‘আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে যদি প্রতিশ্রুত বৈদেশিক সামরিক সহায়তা না পৌঁছায়’ তাহলে জীবন রক্ষার জন্য বরং ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে আলোচনা শুরু করা বাঞ্ছনীয়।

এদিন রাত ১০টায় আকাশবাণী থেকে হিন্দি, উর্দু ও পশতু ভাষায় জেনারেল মানেকশ বাংলাদেশে দখলদার বাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, তোমাদের বাঁচার কোনো পথ নেই। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশকে মুক্ত করার জন্য তোমাদের ঘিরে রেখেছে। তোমরা যে নিষ্ঠুর আচরণ করেছ, তারা তার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। অনেক দেরি হওয়ার আগেই তোমরা আত্মসমর্পণ করো।

আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকেও বাংলা সংবাদ বুলেটিন প্রচার করা হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকেও সকাল-সন্ধ্যায় যুদ্ধের খবরাখবর, দেশাত্মবোধক গান ও চরমপত্র প্রচার করা হয়। এদিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে অর্থনৈতিক সাহায্যদান বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। মার্কিন সিনেটে এবং হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভে ডেমোক্র্যাট দলীয় কোনো কোনো সদস্য পাকিস্তানি জান্তার গণহত্যা, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী নীতির প্রতি মার্কিন প্রশাসনের সমর্থন এবং জাতিসংঘের বিলম্বিত ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন।

লেখক: এস এম শাহনূর
কবি ও আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।