১৫ আগস্ট: ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায় –আদিত্ব্য কামাল

মতামত, 14 August 2022, 149 বার পড়া হয়েছে,
আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট। জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত ও বেদনার দিন। জাতীয় শোক দিবস আজ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৭তম শাহাদাতবার্ষিকী। ১৯৭৫ সালের এই দিন জাতি হারিয়েছে তার গর্ব, আবহমান বাংলা ও বাঙালির আরাধ্য পুরুষ, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। এ দিনে বাঙালি জাতির ইতিহাসে কলঙ্ক লেপন করেছিল সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী কর্মকর্তা আর ক্ষমতালিপ্সু কতিপয় রাজনীতিক। রাজনীতির সঙ্গে সামান্যতম সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু পরিবারের নারী-শিশুরাও সেদিন রেহাই পায়নি ঘৃণ্য কাপুরুষ এ ঘাতক চক্রের হাত থেকে।
সেদিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আরও প্রাণ হারান তাঁর সহধর্মিণী, তিন ছেলেসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্য। বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।
আগস্ট মাস বেদনার মাস। আগস্ট এলেই ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকান্ডের নিষ্ঠুর স্মৃতির পীড়ন তাড়িত করতে থাকে আমাদের। আমরা বিপন্নবোধ করি, অসহায় বোধ করি। জাতির পিতার অকাল মৃত্যুর দগদগে যন্ত্রণায় বিদ্ধ হতে থাকে গোটা জাতি। লেখার শুরুতে স্মরণ করছি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, সেই সঙ্গে স্মরণ করছি ১৫ আগস্টে যারা শাহাদাত বরণ করেছেন তাঁদের সবাইকে। তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করছি। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ বিশ্বের ইতিহাসে এক কালো এবং বর্বরতম ঘটনা। কারণ ঐদিন খুব সকালে নৃশংসভাবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে ঘাতকরা। বঙ্গবন্ধু সিঁড়ির মাঝামাঝি এসে দাঁড়াতেই সঙ্গে সঙ্গে গর্জে ওঠে সিঁড়ির নিচে অবস্থানকারী ঘাতকের হাতের স্টেনগান। আঠারোটি গুলি ঝাঁঝরা করে দেয় বঙ্গবন্ধুর বুক। জাতির পিতা পড়ে যান সিঁড়ির ওপর। তার বুকের রক্তে ভেসে যায় সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকে সেই রক্তের গ্রোত। যেই রক্তে মিশে আছে আমাদের জাতির স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা, বাসনা। ষড়যন্ত্রের বুলেটে বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের সবাইকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে সেই ষড়যন্ত্র আমরা সবাই বুঝতে পারি। যে দেশকে স্বাধীন করল তাঁকে এইভাবে হত্যা করতে পারে মানুষ। ভাবতে কষ্ট লাগে, কি নির্মম, কি নিষ্ঠুর! কি এক হতাভাগা জাতি আমরা! এই হত্যাকান্ডের ফলে আমরা শুধু বিশ্বাসঘাতক হিসেবেই পরিচিতি পাইনি বরং বিশ্বের সামনে আমরা এক অকৃতজ্ঞ জাতিতে পরিণত হয়েছি সেই খুনিদের জন্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর নোবেলজয়ী পশ্চিম জার্মানির নেতা উইলি ব্রানডিট বলেছিলেন, মুজিবকে হত্যার পর বাঙালীদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যে বাঙালী শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে তারা যেকোন জঘন্য কাজ করতে পারে। ব্রিটিশ নাগরিক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক নীরদ সি চৌধুরী বাঙালীদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবকে হত্যার মধ্য দিয়ে তাঁরা জাতি হিসেবে বিশ্বের মানুষের কাছে আত্মঘাতী চরিত্রই প্রকাশ করেছে। ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট দ্য টাইমস অব লন্ডন এ প্রকাশিত ‘সবকিছু সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে সারাজীবন বিশ্ব স্মরণ করবে। কারণ তাঁকে ব্যতীত বাংলাদেশের বাস্তব কোন অস্তিত্ব নেই। একই দিন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়, ‘বঙ্গবন্ধুর ন্যক্কারজনক হত্যাকান্ডকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে মনে করছে এবং করবে বাংলাদেশের জনসাধারণ। যদি ১৫ আগস্টের মীর জাফরদের ঘৃণিত কর্মকান্ড সম্পর্কে কারও একটুও ধারণা থাকে, তবে কারও পক্ষেই ঐ ঘাতকদের মানুষ বলে মনে করা সম্ভব না। এরা কাপুরুষ এবং জাতির সন্তান হিসেবে পরিচয় দেয়ার কোন অধিকার তাদের নেই। এদেরকে নিয়ে কথা বলার মতো রুচিও মানুষের নেই। এরা কি যে নিন্দনীয় এবং পাষন্ডের মতো কাজ করছে! তাদেরকে ঘৃণা জানানোর ভাষাও জানা নেই। জাতি তাদের কোনদিন ক্ষমা করবে না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়, কিন্তু বিচারের কার্যক্রম শুরু হয় অনেক বছর পরে। এটাও জাতির জন্য আরেক দুর্ভাগ্যজনক অধ্যায়। ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় মামলা হয় এবং হত্যাকান্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ১২ নবেম্বর ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ বাতিল করার মাধ্যমে এই হত্যাকান্ডের বিচারের গতিশীলতা ফিরে পায় বাঙালী জাতি ও দেশের নাগরিক। ১৯৯৮ সালের ৮ নবেম্বর ১৫ জনকে মৃত্যদন্ড দিয়ে রায় দেয় ঢাকা মহানগর দায়রা জর্জ আদালত। কিন্তু ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চে তিন জনকে খালাস দিয়ে ১২ জনের মৃত্যুদন্ড বহাল রাখে। ২০০৯ সালের ১৯ নবেম্বর হাইকোর্টের দেওয়া ১২ খুনীর মৃত্যদন্ড আপীল বিভাগেও বহাল রেখে আদেশ জারি করা হয়। অনেকের ফাঁসি কার্যকর হলেও যাদের ফাঁসির রায় এখনও কার্যকর হয়নি তাদেরকে দেশে এনে বিচারের ব্যবস্থা করতে পারলেই দেশের জনগণ শান্তি পাবে এবং কলঙ্ক থেকে মুক্তি পাবে। নতুন প্রজন্মের একজন নাগরিক হিসেবে আজও আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, কিভাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করল কিছু দুষ্কৃতকারী। ভাবতে আমি শিউরে উঠি আতঙ্কে। কারণ যে মানুষটি জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে ছিলেন, যা তার মোট জীবনের এক-চতুর্থাংশ, যাকে ২০ বার গ্রেফতার করা হয় শুধু দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে, যার অসামান্য রাজনৈতিক দূরদর্শিতা আর সাহস দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতা এনে দেয়, তাকেই নিহত হতে হয় দেশের কিছু পথভ্রষ্ট কুলাঙ্গার মানুষের হাতে। আজকে আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছি, স্বাধীন একটি মানচিত্র পেয়েছে শুধু তার নেতৃত্বের কারণে। যে নেতার কারণে আজ বাঙালী জাতি বিশ্বের দরবারে পরিচিত। আমরা এক হতাভাগা জাতি যে তার মতো নেতাকে মেরে ফেলছি। আজ আমরা বিশ্বের ৩৮তম শক্তিশালী অর্থনীতিক দেশ, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধু যদি বেঁচে থাকতো আজ আমরা আরও উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে থাকতে পারতাম। তার নেতৃত্বে যে গুণ, দক্ষতা এবং দুরদৃষ্টি ছিল, তা আর কারও মধ্যে নেই।
সেই বর্বরোচিত হত্যাকান্ডে পাষন্ড ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পায়নি ছোট শিশু রাসেল, এমনকি পরিবারের অন্তঃসত্ত্বা বধূও। রাসেলের মতো নিষ্পাপ ছেলেটিকে বন্দুকের গুলিতে হত্যা করল খুনীরা, মৃত্যুর আগে তার অনুরোধটুকুও কি ঘাতকের মনে একটু দয়া সঞ্চার করতে পারেনি!
বাঙালী জাতির জন্য অত্যন্ত শোকাবহ এবং বেদনাদায়ক একটি মাস আগস্ট। এই মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসের চরমতম ঘৃণিত ও কলঙ্কিত এক অধ্যায়ের সূচনা ঘটেছিল। আগস্টে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল বাঙালীর স্বাধীন রাষ্ট্রের মহান স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ঐ দিন আমাদের জাতির পিতা, মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল শ্যামল বাংলার মাটি। সেদিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যা ঘটেছিল তা পৃথিবীর কোন সুষ্ঠু মানুষ মেনে নিবে না। বরং ঐ ঘাতকদের ঘৃণা করবে এবং বলবে যে বিশ্বের ইতিহাসে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনার যেন আর কোন পুনরাবৃত্তি না হয়।
যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ আর নড়বড়ে অর্থনীতি সত্ত্বেও স্বাধীনতার পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর সরকার অনেক কার্যকরী এবং যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। যা ঐ সঙ্কট পরিস্থিতি ভালভাবেই সামলে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীদের গভীর কূটকৌশলের ফলে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের উপস্থিত সব সদস্যসহ অত্যন্ত নির্মম-নিষ্ঠুরভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়।
শোকাবহ আগস্টের প্রথম দিন থেকে মাসজুড়ে বাঙালী জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। মানুষ ধিক্কার জানাবে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যাকারী মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের, খন্দকার মোশতাকদের। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া ও নানা ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের চূড়ান্ত রায় এবং পাঁচ ঘাতকের ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করা হয়েছে। আমি মনে করি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বাকি খুনীদের দেশে এনে বিচার নিশ্চিত করতে অব্যাহত তৎপরতা জারি রাখবেন। আগস্টের শোকের এই দুঃখজনক ইতিহাসের দায়মোচনের তরে এটাই আজকের বাংলাদেশের কাছে আমাদের প্রত্যাশা।
আদিত্ব্য কামাল,বার্তা সম্পাদক জনতার খবর