হিংসা-লোভ-অহংকার মানুষের পতনের মূল

জনতার কন্ঠ, 3 October 2023, 57 বার পড়া হয়েছে,

লোভ, হিংসা, অহংকার বহু পাপের জন্ম দেয়। যেমন- খুন, গুম, মানবপাচার, যৌতুক, মাদক, যৌনাচার, যৌনদুর্বলতা, এইডস্, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, স্ট্রেজ, মেনিয়া, অকারণে গর্ভপাত ও সিজারিং, জঙ্গিবাদ, অগ্নিকা-, বোমা ও অস্ত্রবাজি ক্রসফায়ার, পর্নো ছবির প্রদর্শনী, রাজনৈতিক গোলামি, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, অর্থনৈতিক শোষণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, যোগ্য নেতৃত্বশূন্যতা, হলুদ সাংবাদিকতা, ক্ষমতার দাপট, টেন্ডারবাজি, খাদ্যে কেমিক্যালের মিশ্রণ, যানজট, সুদ-ঘুষ, দুর্নীতির এমনকি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদির জননী হচ্ছে লোভ, হিংসা, অহংকার।

লোভ, হিংসা ও অহংকার মানুষকে ছোট করে দেয়। লোভের ও হিংসার পরিণাম ভয়াবহ আর অহংকার তো পতনের মূল, এই তিনটি একসাথে হলে জীবন ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।

অনাদিকাল হতেই সামগ্রিকভাবে মানুষের চরিত্রের দুটি দিক বিবেচিত হয়ে আসছে এর একটি ভালো অপরটি মন্দ। সততা, সুবিচার, অঙ্গীকার, সহানুভূতি, দয়া, দানশীলতা, উদারতা, অত্মসংযমী, কর্তব্যপরাণয়তা, সৌহার্দ্য, আন্তরিকতা, মিষ্টভাষী, কমল স্বভাব, হিতাকাক্সক্ষী, সৎকর্মশীল, পুণ্যবান মানব সমাজকে চিরকালই ভালো মানুষ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।

অপরদিকে প্রবৃত্তির অনুসারী ধোঁকাবাজ, মুনাফিক, জেদী, মিথ্যাবাদী, জুলুমবাজ, প্রতিশ্রুতিভঙ্গ, বিশ্বাসঘাতকতা, রুক্ষ আচরণকারী, কুটিল, সংকীর্ণতা, দায়িত্বহীনতা, নিপীড়ন, কুৎসা, চোগলখোরি, বেয়াদব, চোর, ডাকাত, ঘুষখোর, সুদখোর, হিংসা, লোভ, অহংকারীদের চিরকালই ঘৃণার দৃষ্টিতে মূল্যায়িত করা হয়েছে। এ ধরনের মানুষকে জাতি কখনো ভালো লোকের মধ্যে পরিগণিত করেনি।

বড় হওয়ার স্বপ্ন এবং সাধারণ মানুষ থেকে পর্যাপ্ত সম্মান পেয়ে সুখে থাকার ইচ্ছার সব মানুষেরই আছে। কিন্ত শুধু স্বপ্ন দেখলেই তো আর হবে না স্বপ্নকে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তার জন্য আপনাকে অনেক কিছু গ্রহণ করতে হবে আবার অনেক কিছু বর্জন করতে হবে। অর্থাৎ আপনাকে বড় হওয়ার জন্য যা যা করা দরকার সেগুলো ঠিকভাবে করতে হবে এবং যেগুলো ক্ষতি করে তা থেকে বিরত থাকতে হবে। তার মধ্যে এই ৩টি জিনিস মানুষকে অনেক ক্ষতি করে ১) লোভ, ২) হিংসা ও ৩) অহংকার। লোভ, হিংসা ও অহংকার মানুষকে বড় হতে দেয় না, বরং ধ্বংসের মুখে টেনে নিয়ে যায়।

অনেকেই মনে করেন লোভ, অহংকার, হিংসা, পরনিন্দা এগুলো হচ্ছে ক্রিমির মতো। পেটের ভিতর যদি ক্রিমি থাকে, তবে যতোই ডিম-দুধ-মাংস খাওয়া হোক না কেন; তাতে শরীরের কোনো উপকার হয় না। সবকিছু ক্রিমিতে খেয়ে ফেলে। ঠিক তেমনি, আপনার ভিতরে যদি অহংকার-হিংসা-পর নিন্দার বীজ থাকে, তবে আপনি যত পুণ্যই করেন না কেন, যতই পরিশ্রম করেন না কেন, তা ঐ রাক্ষসেরা খেয়ে ফেলবে। এই তিন রাক্ষস শুধু যে পুণ্য ধ্বংস করে তা নয়, এরা আপনাকে পাপের সমুদ্রে সাঁতার কাটতে প্রলুব্ধ করে। এই পৃথিবীতে যারা মহৎ ব্যক্তি হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, তারা সবাই লোভ, হিংসা ও অহংকারকে বর্জন করেছেন।

আমরা প্রায় সবাই জানি অহংকার পতনের মূল অহংকার একটি খারাপ গুণ। এটি ইবলিস ও দুনিয়ায় তার সৈনিকদের বৈশিষ্ট্য; আল্লাহ যাদের অন্তর আলোহীন করে দিয়েছেন। সর্বপ্রথম আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টির উপর যে অহংকার করেছিল সে হচ্ছে— লানতপ্রাপ্ত ইবলিস। যখন আল্লাহ তাকে নির্দেশ দিলেন –

আদমকে সেজদা কর; তখন সে অসম্মতি জানিয়ে বলল: “আমি তার চেয়ে উত্তম। আমাকে বানিয়েছেন আগুন দিয়ে; তাকে বানিয়েছেন মাটি দিয়ে।”

আল্লাহ বলেন: “আর আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করলাম, এরপর আকার-অবয়ব তৈরি করেছি। অতঃপর আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম আদমকে সেজদা কর; তখন সবাই সেজদা করল।

কিন্তু ইবলিস সেজদাকারীদের মধ্যে ছিল না। আল্লাহ বললেন: আমি যখন তোকে সেজদা করার আদেশ দিলাম তখন কিসে তোকে সেজদা করতে বাধা দিল? সে বলল: আমি তার চেয়ে উত্তম। আমাকে বানিয়েছেন আগুন দিয়ে; তাকে বানিয়েছেন মাটি দিয়ে।” [সূরা আরাফ, আয়াত: ১১-১২] তাই অহংকার ইবলিসি চরিত্র। যে ব্যক্তি অহংকার করতে চায় সে জেনে রাখুক সে শয়তানের চরিত্র গ্রহণ করেছে। সে সম্মানিত ফেরেশতাদের চরিত্র গ্রহণ করেনি, যারা আল্লাহর আনুগত্য করে সেজদায় লুটিয়ে পড়েছিল।

লোভ, হিংসা, অহংকার বহু পাপের জন্ম দেয়। যেমন- খুন, গুম, মানবপাচার, যৌতুক, মাদক, যৌনাচার, যৌনদুর্বলতা, এইডস্, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, স্ট্রেজ, মেনিয়া, অকারণে গর্ভপাত ও সিজারিং, জঙ্গিবাদ, অগ্নিকা-, বোমা ও অস্ত্রবাজি ক্রসফায়ার, পর্নো ছবির প্রদর্শনী, রাজনৈতিক গোলামি, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, অর্থনৈতিক শোষণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, যোগ্য নেতৃত্বশূন্যতা, হলুদ সাংবাদিকতা, ক্ষমতার দাপট, টেন্ডারবাজি, খাদ্যে কেমিক্যালের মিশ্রণ, যানজট, সুদ-ঘুষ, দুর্নীতির এমনকি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদির জননী হচ্ছে লোভ, হিংসা, অহংকার।

লোভ মানুষের পরম শত্রু। লোভ মানুষকে অন্ধ করে তার বিবেক বিসর্জন দিয়ে তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। লোভের বশবর্তী হয়ে মানুষ জীবনের সর্বনাশ ডেকে আনে। মানুষ নিজের ভোগের জন্য যখন কোনো কিছু পাওয়ার প্রবল ইচ্ছা পোষণ করে তাকে লোভ বলে। তখন যা নিজের নয়, যা পাওয়ার অধিকার তার নেই, তা পাওয়ার জন্য মানুষ লোভী হয়ে ওঠে। সে তার ইচ্ছাকে সার্থক করে তুলতে চায়। লোভের মোহে সে সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ সব বিসর্জন দেয়। তার ন্যায়-অন্যায় বোধ লোপ পায়।

সে পাপের পথে ধাবিত হয়। নিজের স্বার্থের জন্য সে অন্যের সর্বনাশ করতে কখনও কুণ্ঠাবোধ করে না। এভাবে লোভ মানুষকে পশুতে পরিণত করে। ডেকে আনে মৃত্যুর মতো ভয়াবহ পরিণাম। তাইতো বলা হয়Ñ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’। লোভ মানব চরিত্রের এক দুর্দমনীয় প্রবৃত্তি

আমরা তো জানি, লোভ হিংসা ও অহংকার এই তিনটি বস্তু মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। কিন্ত তারপরেও কি বন্ধ হচ্ছে, আমাদের জীবন থেকে দূর করতে পারছি? না এখনও আমাদের মাঝে রয়েছে। তাই যদি আপনি সুখী হতে চান, জীবনে অনেক বড় কিছু হতে চান, সাধারণ মানুষ ভালোবাসা পেতে চান, তাহলে লোভ, হিংসা ও অহংকার থেকে বিরত থাকুন। এর জন্য সঠিক পথে চলার জন্য আমাদেরকে আরও শক্ত হতে হবে, ভালোভাবে প্রতিজ্ঞা করতে হবে।

আমরা যদি সমাজে শান্তি চাই, যদি মনুষ্য সমাজকে শান্তির সমাজে পরিণত করতে চাই, যদি আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনাকে আমাদের চলার পথের পাথেয় করতে চাই তবে হিংসা, বিদ্বেষ, ঈর্ষা ও পরশ্রীকাতরতা থেকে দূরে থাকতে হবে। ব্যক্তি, পারিবারিক সমাজিক ও জাতীয় জীবনে পতন ডেকে আনতে পারে যে অপগুণ তা থেকে নিরাপদ দূরে থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের সে সক্ষমতা দান করুন। আমিন।

লেখক – হাজী জসিম উদ্দিন জমসেদ, দৈনিক মাতৃজগৎ