পাঠকনন্দিত হোক কবি সফিকুল ইসলামের ‘যে কথা যায়না বলা’ – এস এম শাহনূর

জনতার কন্ঠ, 26 February 2022, 322 বার পড়া হয়েছে,
কবি সফিকুল ইসলামের লেখা ‘যে কথা যায়না বলা’ আদ্যোপান্ত পড়লাম। ২০২২ সালের অমর একুশে বইমেলায় সদ্য প্রকাশিত হলো এ কাব্যগ্রন্থটি। কবিতার মানুষ, কাব্যের সাথে পেতেছি সংসার, তাই আর সব থেকে কবিতা পড়তে ভাল লাগে। ‘যদি যাহা চাই, তাহা পাই’ তখন আরো ভাল লাগে। সত্যি কবিতাগুলো ভাবে,শব্দে আর কালের বিচারে ভাল লাগার মতো। আমারও ভাল লেগেছে। কবিগুরু তাঁর গীতবিতানে লিখেছেন, “অনেক কথা যাও যে ব’লে কোনো কথা না বলি।” ‘যে কথা যায়না বলা’ পাঠান্তে আমার কাছে তাই মনে হয়েছে। রবি ঠাকুর যদিওবা বলেছেন, “তােমার ভাষা বােঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি” কিন্তু কবি সফিকুল ইসলাম কবিগুরুর মত আশাহত হননি। ব্যক্তি জীবনে বিসিএস প্রশাসনের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা হলেও সমাজের নানা অনিয়ম অসঙ্গতি কখনো কখনো কবি হৃদয়কে বিদীর্ণ করেছে। অনুরণিত হয়েছে তাঁর মনোজগৎ, যার ছাপ অধিকাংশ কবিতায় প্রতীয়মান। কবি সফিকুল ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার বাদৈর গ্রামের সন্তান। ১৯৭৮ সালে একই উপজেলার মেহারী ইউনিয়নের বল্লভপুর গ্রামে মাতুলালয়ে কবির জন্ম। আমার থেকে বয়সে ১/২ বছরের বড়। সম্পর্কে ভাগিনা। কবির শৈশব ও কৈশোরে একই পরিবেশে আমাদের বেড়ে উঠা। ছাত্র জীবনে প্রতিবারই মেধার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। ইন্টারমিডিয়েটে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে সম্মিলিত মেধা তালিকায় নাম ছিল তাঁর।  পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিং-এ বিবিএ ও এমবিএ করেন। জাপানের কোবে ইউনিভার্সিটি থেকে এমফিল ও অস্ট্রেলিয়া থেকে রাজনৈতিক অর্থনীতিতে পিএইচডি করেন। সেই শৈশব থেকে দেখেছি, বুকে রক্তজবার মত ক্ষত ধারণ করলেও মুখে সূর্যমুখীর হাসি থাকে তাঁর।
বাংলা বর্ণমালায় যেমন ৫০টি বর্ণ রয়েছে,বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পুর্তি-সুবর্ণজয়ন্তীর আবেশে ‘যে কথা যায়না বলা’ কাব্যগ্রন্থটিতে ভিন্ন স্বাদ,গন্ধ আর বর্ণের মোট ৫০টি কবিতা রয়েছে। কবিতাগুলো না পড়লে কবি সম্পর্কে সম্পূর্ণ জানা হবেনা। যদিও এটি কবির প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ তবু কবিতাগুলো পাঠে পাঠক মাত্রই সমৃদ্ধ হবেন,ঋদ্ধ হবেন। ৫০টি কবিতার অধিকাংশ মুক্ত ছন্দে, কিছু অন্ত মিলের গদ্যাকারে এবং অল্প সংখ্যক অক্ষর বৃত্ত ছন্দে লেখা হয়েছে।
 শুরুতেই ‘বিদ্রোহীর বিষ’ নামক কবিতা দিয়ে তিনি সাজিয়েছেন তাঁর কবিতামালা। কবির কলমে ঝরেছে..
“সারাক্ষণ ঘুমাই শুধু, আলাভোলা বুদ্ধিহীনের মতো
হাবাগোবার মতো,কুম্ভকর্ণের মতো।
না ঘুমিয়ে উপায় কী? জেগে উঠলেই আমি বিদ্রোহী। “
কবি হেমলক বিষ খান,গণতন্ত্রের নামে বাহুবলীর বিষও খান। কিন্তু কেন? অনেক প্রশ্ন, অনেক ভাবনা। কবিতাটি পাঠরত অবস্থায় পাঠকমাত্রই ভাবুক হবেন। হয়তো হবেন কবি। এই একই কবিতার শেষে লিখেছেন,
“আমি মরেছি,আমার ভাবনা মরেনি
আত্মা মরেনি,স্বপ্ন মরেনি,বিপ্লব মরেনি
আলো জ্বেলে করবে দূর আঁধার রজনী। “
কী চমৎকারভাবে, সহজ শব্দের দোলায় ভাবনার গভীর থেকে গভীরে হারিয়ে যান কবি। আবার মণি-মুক্তা সদৃশ
কিছু শব্দ নিয়ে ভেসে উঠেন। বুক ভরে নেন স্বস্থির নিশ্বাস। এমনি করে গভীর ঘুম থেকে,নরক যন্ত্রণা থেকে মুক্তির মন্ত্রটিও কবির কবিতায় ভাস্বর।
চমৎকার বোর্ড বাঁধাই করা ৭৮ পৃষ্ঠার এ কাব্যগ্রন্থটির জন্য একটি সুন্দর প্রচ্ছদ এঁকেছেন- নির্ঝর নৈঃশব্দ। আগামী প্রকাশনী থেকে বইটি প্রকাশ করেছেন-ওসমান গণি। বইটির মলাট মূল্য রাখা হয়েছে দুইশত টাকা। ফ্ল্যাপে লেখা হয়েছে, “মানুষ অনেক কথা মুখ ফুটে বলে না, পারিবারিক. সামাজিক, ধর্মীয় অনুশাসন বা নানান পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে। মানুষ না বললেও মানুষের মনে কথাগুলো বাজে, হৃদয়ে অনুরণন হয়। ঘর বা পরিবারের কথা হোক, সমাজের কথা হোক, পরিবেশ বা ধর্মের কথা হোক, ব্যক্তিগত প্রেমের কথা হোক, কিংবা নিষিদ্ধ সম্পর্কের কথা হোক। আমরা অনেক কথা বলি না। অথচ কথাগুলো আমাদের ভেতরে অনবরত ঢেউ খেলতে থাকে। বইয়ের কবিতাগুলোও সেরকম সব কথা যা আমরা সচরাচর বলি না , কিন্তু আমাদের মননে মগজে এসব কথা খই ফুটতে থাকে, হাতুরি পেটানোর মতো দ্রিম দ্রিম মাথায় বাজতে থাকে। সেসব অনুভূতিই নানান রূপক শব্দ বা গল্পে, কল্পনার ফানুসে, ছন্দের খেলায় উঠে এসেছে কবিতাগুলোতে।”
……
“পৃথিবী নামক মাটির উপর দাঁড়িয়ে দেখি
পায়ের নিচে মাটি নেই।
প্রেমের সাগরে ডুব দিয়ে দেখি
গহবর আছে, প্রেম নেই।” [শূন্যতা]
……
“প্রতিবেশী তারা প্রতিবেশী মোরা
বিপদে আপদে পরম হিতৈষী সদা
স্বজন হয়ে  দিবানিশী করে মেশামেশি
সম্পর্ক বাঁধনে তবু হাজার কষাকষি।” [প্রতিবেশী]
…..
“তোমার আমার হয়না দেখা বহুদিন ধরে
নেই সুযোগ কাছাকাছি মুখোমুখী বসিবারে
দিনে রাতে দেখা তবু তোমার সাথেই ঘটে
ক্ষণে ক্ষণে আড়ে আড়ে চোখাচোখি চলে।
দৃষ্টিসীমার বাইরে মোরা যত দূরে যাই
শব্দ স্বভাব, গন্ধ ও ভাব সবই পেয়ে যাই।” [মারফতি ভাব]
…..
“আমি যখন উষ্ণ গরম। কিংবা
আগ্নেয়গিরির লাভার মতো, হিরোশিমার জ্বলার মতো,
উনুনসিদ্ধ জলের মতো, তেলের পিঠার তেলের মতো
ফুটছি টগবগ পরম।
তুমি তখন দরজা আজাও,
কেউ দেখে ফেললো কিনা, বাচ্চারা আসলো কিনা
জানালাটা খোলা কিনা, পর্দার মাঝে ফাঁক কিনা।
তুচ্ছ বিষয় জড়াও।” [উষ্ণতার মুহুর্তে]
……
“যদি এমন হতো, ইচ্ছেমতো পেতাম সব ফিনিশ পাখির মতো
মায়ের কোলে থাকবো শুয়ে, বাবার হাত থাকবো ধরে
পরীর পাখায় উড়বো দূরে, সাত আকাশের তাঁরার পানে
চকলেটা খাবো পেটি পুড়ে, খেলার সাথী করবো বিয়ে
মনজুড়ে যা খেলা করে সব থাকবে আমার ঘরে
যে দেখবে তার চক্ষু যেন অবাক বনে যেতো।” [যদি এমন হতো]
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কবিতাগুলোতে মানবিক মূল্যবোধ,নারী,সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র, গ্রামীণ জীবনাচার,কৃষি, প্রেম পরিবেশ, প্রকৃতির কথা বিধৃত হয়েছে। যাপিত বাস্তবতার সাথে কল্পলোকের মহামিলনের মোহন বাঁশির সুর বেজে উঠেছে কবির কবিতায়। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা মিলান শহর ইঁদুর মুক্ত করেছিলো কিন্তু শহরের মেয়রের সংকীর্ণ মনকে কলুষযুক্ত করতে পারেনি। আশা কবি সফিকুল ইসলামের না বলা কথার বাঁশি ক্ষণিকের জন্য হলেও মানসিক ও মানবিক উন্নয়নে সহায়ক হবে। আমার লেখাটি শেষ করব কবির শুরু দিয়ে।  বিদগ্ধ পাঠক কবির উৎসর্গ পত্র পাঠেই অনুধাবন করবেন, তিনি কবি এবং একজন সত্যিকারের শব্দ গাঁথুনে।
উৎসর্গ:
“জীবনের মন্দায়, অসময়ে, দুর্দশায়, বঞ্চনায়, অসহায়ত্বে ও নিঃসঙ্গতায় যারা স্নেহ-ভালােবাসা দিয়ে, যত্ন দিয়ে, হাত বাড়িয়ে, উৎসাহ দিয়ে, প্রশংসা করে আমার মনােবল ও আত্মবিশ্বাস জাগিয়েছেন এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ প্রসারিত করেছেন। তাঁদের সকলকে।”
আমি বইটির বহুল প্রচার ও পাঠকপ্রিয়তা আশা করছি
সেই সাথে লেখকের দীর্ঘ নেক হায়াত কামনা করছি।
লেখক: এস এম শাহনূর 
কবি ও আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।